অনেকদিন থেকে খুব ইচ্ছে হচ্ছিলো আমার পুরো পরিবার নিয়ে দূরে কোথাও হতে ঘুরে আসবো, আল্লাহর অশেষ রহমতে আমার সেই আশা পূর্ণ হতে চলছিলো। কারণ কয়েকমাস পূর্বে জাকির ভাই একদিন বললো, চল সাজেক থেকে ঘুরে আসি। আমি বললাম, না ভাই টাকা পয়সার সংকট; গত বছরের করোনার প্রভাব আমার কপালে খুব ভালো ভাবেই পড়েছে। তাই এই মুহূর্তে কোন ভ্রমণের কথা ভাবাই যাবে না। জাকির ভাই বললো, টেনশন নিশ না, আমরা সবাই অফিস থেকে যাবো। আমি বললাম দেখা যাক।
To find this blog in English; click the link below: https://iamnrdurjoy.wordpress.com/2021/03/18/nrds-tour-056-english/
গত ১৩ জানুয়ারি ২০২১ তারিখে, হঠাৎ করে জাকির ভাই আমাকে ইউ এস বাংলার যাওয়া আসার কয়েকটি টিকেট কেনার রিসিট দেখালো। আমি তখন বুঝতে পারলাম জাকির ভাই মজা করছে না, সত্যিই যাবার পরিকল্পনা করছে। কে কে যাবো জিজ্ঞেস করার পর জাকির ভাই জানালো আমরা সবাই যার যার পরিবার নিয়ে যাবো।
তারপর হঠাৎ চলে আসলো সেই সন্ধিক্ষণ, পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৯ জানুয়ারির সকাল ৯ টা ১৫ মিনিটের মধ্যে ঢাকার অভ্যন্তরীণ বিমান টার্মিনালে উপস্থিত হবার কথা ছিলো। আমি তো ভ্রমণের কয়েকদিন আগে থেকেই উত্তেজিত। যার কারণে ঐদিন ভোর ৬ টায় আপনা আপনি আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। আমার উঠার সাথে সাথে আমার ছেলে দুলকারও ঘুম থেকে উঠে যায়। সক্কাল সক্কাল ফ্রেশ হয়ে, সকালের নাস্তা সেরে ঠিক ৮ টা ৩০ মিনিটে নতুনবাজার থেকে আমার পুরো পরিবার নিয়ে হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরের জন্য রওয়ানা দিয়েছিলাম। মাত্র ১০ মিনিটের রিক্সা আর ২০ মিনিটের সিএনজি ভ্রমণে খুব দ্রুত সকাল ৯ টায় ঢাকা বিমানবন্দরে গিয়ে পৌছেছিলাম।
যেহেতু ওটাই ছিলো আমার জীবনের প্রথম বিমান ভ্রমণ, আমি সঠিক যানতাম না ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে যাবার বিমান কোথায় থাকে। প্রায় ৩০ মিনিটের অপেক্ষার পর যখন আসিফকে ফোন দিলাম, সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারলাম সিএনজি চালক আমাকে ভুল টার্মিনালে নিয়ে গিয়েছে। কারণ আমি সিনজিতে উঠার পর ওনাকে বলেছিলাম আমাদের ডমেস্টিক বা অভ্যন্তরীণ টার্মিনালে নামাতে।

যাই হোক ভুল সে করুক তাতে কী? কষ্টটাতো আমাদেরই করতে হবে। বিমানবন্দর থেকে একটি ট্রলিতে তিনটি ব্যাগ আর একটি ট্রাইপড নিয়ে ইন্টারন্যাশনাল টার্মিনাল থেকে মাত্র ৩০০ গজ দূরত্বের অভ্যন্তরীণ টার্মিনালে পৌছালাম। ঠিক ৯ টা ৩০ মিনিটে অভ্যন্তরীণ টার্মিনালে গিয়ে আসিফ এবং তার পরিবারের সাথে দেখা হলো। ওখানে গিয়ে জীবনে প্রথমবারের মতো বিমানবন্দরের লাইনে দাড়ালাম। মনে একটু চিন্তা হচ্ছিলো, কিন্তু আনন্দ কোন অংশেই কম ছিলো না। আসলে চিন্তা হচ্ছে, জীবনে প্রথমবারের মতো বিমানবন্দরের অভিজ্ঞতা কেমন হয়, তার ওপর আমার সাথে আসার স্ত্রী ইসরাত আর আমার ছেলে দুলকার। বিমানবন্দরে অবস্থান করে সর্বপ্রথম আমরা ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্স থেকে আমাদের ১২ জনের বোর্ডিং পাশ নিয়ে নেই। ও আপনাদের তো বলাই হয়নি আমরা ১২ জনের কথা যারা ওই ৩ দিনের ভ্রমণের সবসময় একসাথে ছিলাম।
আমাদের এ ভ্রমণের পর্যটক হিসেবে ছিলো, জাকির ভাই তার স্ত্রী, মেয়ে আর মামি মিলে ৪ জন, আমি আমার স্ত্রী, ছেলে নিয়ে ৩ জন। আসিফ তার স্ত্রী, মেয়ে আর ছোট ভাই মিলে ৪ জন। আর হাফিজ একমাত্র উনি নিজে। এবারের ভ্রমণটিতে হাফিজের সদ্য বিবাহিত স্ত্রীরও যাবার কথা ছিলো। ওনার জন্য যাওয়া আসার টিকেট নেয়া হয়েছিলো। কিন্তু হঠাৎ করে মাস্টার্স পরীক্ষার সিডিউল পরার কারণে উনি এই ভ্রমণটি মিস করেছেন।

বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ টামির্নালে ঢুকতেই প্রথমে একটি চেকিং করা হয়। এই চেকিংয়ের পরেই বোর্ডিং পাশ রুমে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে৷ বিমানবন্দরে একে একে সবার চেকিং হবার পর আমি আর আসিফের পরিবার একসাথে বোর্ডিংপাশের একপাশে অপেক্ষা করছিলাম। দুলকার হঠাৎ খাবারের জন্য কান্না করার কারণে আমি ওর জন্য খাবার কিনতে যেয়ে জাকির ভাইয়ের দেখা মিললো। জাকির ভাই আসার ঠিক কিছুক্ষণ পর হাফিজ এসে পৌঁছেছিলো। বিমানবন্দরের ভিতরের খাবারের দাম খুবই ব্যয়বহুল। তিন পিস কেকের দাম ১২০ টাকা যার দাম বাহিরের কোন দোকানে সর্বোচ্চ ৩০ টাকা হবে।
যাইহোক, বোর্ডিং পাশ নেবার পর আমরা সবাই ২য় বারের মতো পুনরায় আরেকটি চেকিংয়ের অভিজ্ঞতা গ্রহণ করি। এবারের চেকিংটা একটু আলাদা ছিলো। কেননা এবারের চেকিংয়ে জামা, প্যান্ট, মোজা ছাড়া শরীরের সমস্ত কিছু খুলে ফেলতে হয়েছিলো। এর সমস্ত কিছুই করা হয়েছিলো আমাদের সবার নিরাপত্তার জন্য।
চেকিং কাজ শেষ হবার পর আমরা সবাই লাইন ধরে ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্স কোম্পানির একটি বাসে উঠেছিলাম। সেই বাসটি আমাদের ২০ মিনিট পর আমাদের কাঙ্খিত বিমানের সামনে নিয়ে যায়। আসলে বিমানবন্দর থেকে বিমানটি ওতটা দূরে নয়। শুধুমাত্র অনেক কম গতিতে গাড়ি চালানোর জন্য এতটা সময় লেগেছিলো। পরে এ বিষয়ে খোজ নিয়ে জানতে পারলাম, ওটাই নাকি সকল বিমানবন্দরের নিয়ম। বিমানের উপর উঠতে আমাদের আরেকটি চেকিং করা হয়।এবার আমার হাতের সমস্ত ব্যাগগুলোর মধ্যে আমার ট্রাইপডিটি নিয়ে যায়। যার কারণে আমি রিতীমতো ঘাবড়ে যাই। ভেবেছিলাম হয়তোবা তারা আমার ট্রাইপডটি নিয়ে যাবে।
না! আমার ধারণাটি ভুল ছিলো। তারা বলে ট্রাইপডটি বড় হবার কারণে বিমানের সিটে করে নিয়ে যাওয়া যাবে না। তারা আমার ট্রাইপডটি বিমানের কেবিনে নিয়ে যায় আর আমাকে হাতে একটি রিসিট ধরিয়ে দেয়। পরবর্তীতে যে রিসিটটি দেখিয়ে ট্রাইপডটি নিতে হয়েছিলো।

তারপর আমরা সবাই বিমানে উঠে যাই। বিমানে উঠে যেই জিনিসটি আমাকে অবাক করে তা হচ্ছে ভিতরের চেয়ারের সাইজ। আমার মতো ছয় ফুটের মানুষের জন্য বিমানের চেয়ারের সাইজটি যথেষ্ট বেমানান। হয়তোবা অভ্যন্তরীন ফ্লাইট হবার কারণে সিটের সাইজ এতোটা ছোট ছিলো।
ঠিক ১০ টা ৫৫ মিনিটে ফ্লাইট এটেন্ডেন্টের কন্ঠ ভেসে উঠলো। কিভাবে সিটবেল্ট ব্যবহার করতে হয়, কিভাবে বিমানে ঝুকিমুক্তভাবে থাকা যায়, এগুলোই ছিলো তার কথা। ওনার কথা শুনে বিমানের অনেক নিয়ম জানতে পেরেছিলাম।
বিভিন্ন ধরণের প্রথাগত কথা বলে অবশেষে বিমানটি ধীরে ধীরে মাটি থেকে উপরে উড্ডয়ণ শুরু করলো। আমার সিটটি ছিলো BS-103 ফ্লাইটের 7A এবং আমার স্ত্রীর ছিলো 7C । যা মূলত পাশাপাশি ছিলো। আমি আমার পছন্দের জানালার সিটটিই পেয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের ব্যাগ ওখানে রাখার পর জায়গা না থাকার কারণে আমাকে জাকির ভাইয়ের পাশের সিটে বসতে হয়েছিলো।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের বিমান প্রায় ১৫,০০০ ফুট উপরে উড়তে শুরু করলে। আমার প্রথমবারের মতো বিমানে চড়ার অভিজ্ঞতাটি ছিলো মিশ্র প্রতিক্রিয়ার। উপরে উঠার সময় আমার মাথাটি হালকা চিনচিন করতে শুরু করে। জাকির ভাইকে এ অনুভূতি সম্পকের্ জিজ্ঞাসা করার পর উনি জানালো এ ব্যাপারটি স্বাভাবিক এবং প্রায় নতুন বিমান অভিজ্ঞতা সম্পন্ন যাত্রীদের সাথে বেশি হয়। এ সময়টাতে শ্বাস প্রশ্বাস বন্ধ করে থাকাটা নাকি বুদ্ধিমানের কাজ।
প্রায় ৩৫ মিনিট পর ঠিক ১১:৩০ মিনিটে আমাদের ফ্লাইট BS-103 চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরে অবতরণ করে। অবতরণ করার পর আমরা সবাই বিমান থেকে নেমে পড়ি। নামার পর আমি কনবেয়ার বেল্টের সামনে অপেক্ষা করি। কারণ বিমানের স্টাফদের কাছ থেকে জানতে পারি আমার ট্রাইপডটি ওখান থেকেই সংগ্রহ করতে হবে। কনবেয়ার বেল্টে প্রায় ১০ মিনিট অপেক্ষা করার পর আমার ট্রাইপডটি আমি সংগ্রহ করেছিলাম।

ঐদিকে আমাদের জন্য চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে একটি ১০ সিটের মাইক্রোবাস অপেক্ষা করছিলো। বিমানবন্দরে আমাদের প্রয়োজনীয় কাজ সেরে ঠিক ১১:৪০ মিনিটে মাইক্রোবাসে করে খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। মাইক্রোবাসে করে যাচ্ছিলাম আর বিমানবন্দরের আশেপাশের প্রকৃতি উপভোগ করছিলাম।

যেহেতু আমার পরিবার এবং কাছের মানুষদের সাথে এটাই আমার প্রথম ভ্রমণ, আমি একারণে একটু বেশিই উত্তেজনায় ছিলাম। খাগড়াছড়ি যাবার একপর্যায়ে ঠিক ২ টা ২০ মিনিটে আমাদের মাইক্রোবাসটির একটি চাকা নষ্ট হয়ে যায়। নিচে নেমে কারণ খুজতে গিয়ে জানা যায় রাস্তার অবস্থা খারাপ হবার কারণে অতিরিক্ত প্রেশারে চাকাটি নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো। ভাগ্য কিছুটা ভালো ছিলো এ কারণে বলবো যে ড্রাইভার সাহেবের কাছে অতিরিক্ত চাকা ছিলো। অতিরিক্ত একটি চাকা থাকার কারণে প্রায় ১৫ মিনিটের সময়ক্ষেপণের মাধ্যমে আমরা আবার খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম।

আমাদের পরিকল্পনা ছিলো খাগড়াছড়িতে গিয়ে হোটেল গাইরিংয়ে দুপুরের লাঞ্চ সারবো। সেভাবেই আমাদের হোটেলে বুকিং করা ছিলো । কিন্তু অর্ধেক রাস্তায় গিয়ে আমাদের দুপুরে খাবারের ক্ষুধা আর থেমে রাখা গেলো না। ঠিক ২:৪৫ মিনিটে আমরা সবাই চট্টগ্রাম এবং খাগড়াছড়ির মাঝামাঝি কোন এক হোটেলে গিয়ে আমাদের মধ্যাহ্ন ভোজ সেরে নিয়েছিলাম। খাবারের মান বলতে অতটা ভালো ছিলো না। স্থানীয় একটি হোটেল হবার কারণে ওখানে ভালো খাবার ছিলো না। আর তাই আমরা সবাই শুধু মুরগির গোশত দিয়ে আমাদের ঐদিনের দুপুরের মধ্যাহ্ন ভোজ সেরে নিয়েছিলাম। আমাদের দুপুরের খাবারের দাম হয়েছিলো প্রত্যেকে গড়ে ১০০ টাকা করে মোট ৯০০ টাকা।
মধ্যাহ্ন ভোজ সারার পর আমরা সবাই আবার হোটেল গাইরিংয়ের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। প্রায় ৫ ঘন্টা মাইক্রোবাস ভ্রমণ করার পর ঠিক ৫:০৫ মিনিটে আমরা আমাদের গন্তব্যতে পৌছালাম। হোটেলে পৌছে আমরা সবাই নতুন জীবন ফিরে পেলাম। আপনাদের সাথে হোটেল গাইরিংয়ের কিছু গুরত্বপূর্ণ তথ্য শেয়ার করছি।
খাগড়াছড়ি জেলার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত হোটেল গাইরিংটি ত্রিপুরাদের মালিকানায় পরিচালিত একটি হোটেল। আমরা হোটেলটিতে দুইটি কাপল বেড এবং দুইটি ডাবল বেড ভাড়া করেছিলাম যার প্রত্যেকটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। কাপল বেডগুলোর ভাড়া প্রতিটি ১,৮০০ টাকা করে যা আমরা স্পেশাল ডিসকাউন্টে ১,৫০০ টাকায় ভাড়া করেছিলাম। অন্যদিকে আমরা দুটি ডাবল বেড যার মূল ভাড়া ২,৫০০ টাকা, ২,০০০ টাকায় ভাড়া করেছিলাম। মূলত প্রতিটি রুমের সদস্যদের জন্য সকাল বেলা কমপ্লিমিন্টারি সকালের নাস্তা ছিলো আমরা যা গ্রহণ করি নি। যার কারণে কাপল বেড রুমে ৩০০ টাকা করে এবং ডাবল বেড রুমে ৫০০ টাকা করে ডিসকাউন্ট করা হয়েছিলো।
এবার আসা যাক রুমগুলোর বর্ণনায়। হোটেল গাইরিংয়ের কাপল বেড রুমে একটি ছয় ফিট সাত ফিটের বেড রয়েছে সাথে দুটি বালিশ এবং একটি কম্বল। এছাড়াও একটি একক সোফা, একটি টেবিল, একটি প্লাস্টিকের চেয়ার, একটি ইন্টারকম এবং একটি ওয়াশরুম রয়েছে। ওয়াশরুমে একটি বেসিন, একটি হাই কমোড, দুটি কল, একটি ঝর্ণার ব্যবস্থা আছে। দুটি পানির কলের একটি দিয়ে নরমাল পানি এবং একটি দিয়ে গরম পানির ব্যবস্থা রয়েছে।
কাপল বেডের সাথে ডাবল বেডের পার্থক্য বলতে কাপল বেডরুমের একটি বড় খাটের জায়গায় দুটি মাঝারি বেড। এছাড়া অন্যান্য ব্যবস্থা প্রায়ই এক। এবারের টুরে আমার রুম নম্বর ছিলো ১০২। আপনারা আমার ভিডিওতে যে রুমটি দেখছেন এটি আমারই রুম।
সন্ধ্যার দিকে হোটেলে চেক ইন করে আমাদের শরীরে যথেষ্ট শক্তি ছিলো না এবং আমাদের যথেষ্ট সময়ও ছিলো না ভ্রমণ করার। আর তাই আমরা সকল পুরুষ সদস্যরা খাগড়াছড়ি শহরে ঘুরতে বের হলাম। আসলে আমাদের বাহিরে বের হবার সবচেয়ে বড় কারণ ছিলো পরেরদিন সাজেকে ঘুরতে যাবার জন্য একটি গাড়ি ঠিক করার। আঞ্চলিকভাবে যে গাড়িগুলোকে চান্দের গাড়ি বা চাঁদের গাড়ি বলা হয়।
হোটেল থেকে বের হবার সময় আমাদের সাথে এক বাংলাদেশী পাহাড়ি ভাইয়ের সাথে দেখা হয়ে যায়। ভাইয়ের নাম ছিলো জ্যাকি। তার সাথে কথাবার্তা বলে বুঝতে পারলাম তিনি চান্দের গাড়ির একজন চালক। ওনার কাছ থেকে সাজেকে ঘুরতে যাবার প্যাকেজের কথা জানতে চাইলে উনি বলেন ৯,৭০০ টাকা খরচে উনি সাজেকের সমস্ত স্পটসহ খাগড়াছড়িরর আলুটিলা গুহা সহ প্রায় স্পট ঘুরে দেখাতে পারবেন। উনার কাছ থেকে দাম জানার পর আমরা যথারিতী দাম কষাকষি শুরু করলাম। অনেকক্ষন দাম কষাকষির পর বুঝতে পারলাম ৯,৭০০ টাকা সাজেক ভ্রমণকারীদের জন্য সাজেক চালক সমিতি রেট ধরে দিয়েছে।
এরপরও আমরা আরে গাড়ির খোজে খাগড়াছড়ির প্রাণকেন্দ্রে ঘুরতে বের হলাম। সাজেক চান্দের গাড়ি চালক সমিতির অফিসের সামনে গিয়ে দেখি অনেক মানুষের ভিড়। আমাদের বুঝতে বাকি রইলো না ওখানে গ্যানজাম চলছে। চলবেই বা না কেন? অনেক মানুষের আনাগোনা এই খাগড়াছড়িতে। তাদের সবারই একই উদ্দেশ্যে। সাজেক ভ্যালীতে ঘুরা। হাটতে হাটতে হঠাৎ এক স্থানীয় লোকের সাথে দেখা হলো। তাকে চান্দের গাড়ির কথা বলতে তিনি আমাদের সাহায্য করবে বলে জানালেন।

কিছুক্ষন কার সাথে যেন কথা বলার পর উনি আমাদের বলে উঠলো ” ভাই যদিও মালিক সমিতে কর্তৃক রেট ৯,৭০০ টাকা করে, গ্যানজাম আর গাড়ির কম থাকার কারণে আমি ১২,০০০ টাকায় আপনাদের ব্যবস্থা করে দিবো।” আমাদের আর বুঝার বাকির রইলো না ব্যাটা একটা ধান্দাবাজ।আর তাই আমরা কালক্ষেপণ না করে পুবের্র কথা বলা জ্যাকি ভাইকে ফোন দিলাম। তাকে ফোন দিয়ে ২০ ফেব্রুয়ারিতে আমাদের সাজেকে যাবার জন্য বুক করে নিলাম।
পরেরদিনের জন্য গাড়ি বুক করে আমাদের চিন্তা কমে গেলো। আমরা এবার খোজ নিলাম খাগড়াছড়ির খাবার হোটেলের যেখান থেকে আমরা সন্ধ্যার নাস্তা সারবো। হাটতে হাটতে আমরা খাগড়াছড়ি সদরের শাপলা চত্বরের মহসীন মার্কেটের মনটানা হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্টের সামনে গেলাম। বাহির থেকে হোটেলটি ভালই লাগছিলো। তাই সময় নষ্ট না করে আমরা সবাই ঢুকে পড়লাম। ভিতরে গিয়ে বিভিন্ন মেনু দেখে আমরা মুরগির কাবাব অর্ডার দিলাম যার প্রত্যেকটির দাম প্রায় ৬০ টাকা এবং দুইটি করে ছোট পরোটা যার প্রত্যেকটির দাম ১০ টাকা। ওখানে আমরা পাঁচজন নাস্তা করে বাকি চারজনের জন্য পাসের্ল নিয়ে নিলাম।




মনটানা হোটেল এবং রেস্টুরেন্টের সম্মুখ ভাগ
সন্ধ্যার নাস্তা সেরে আমরা যখন হাটছিলাম পথিমধ্যে আমরা পাহাড়ি কিছু কলার দেখা পেলাম। সচরাচর আমরা সবাই ঢাকা থেকে কলা খাই কিন্তু পাহাড়ি কলার স্বাদটাই অন্যরকম যা আপনার সবাই ভালো করে জানেন। দোকনদারকে দাম জিজ্ঞেস করার পর উনি বললেন কলার ডজন ৮০ টাকা। দরদাম করার পর আমরা দুই ডজন আর তিনটি কলা প্রায় ৯০ টাকায় ক্রয় করি। কলা ক্রয় করার এক পর্যায়ে একটি ভিন্ন ডিজাইনের একটি কলা আমাদের নজর কাড়ে। কলাটি দেখতে অনেকটা লালচে আর বাদামি রংয়ের। কলার দাম জিজ্ঞেস করতে দোকানি প্রতি কলা ২০ টাকা দাম বললো। কলার দাম শুনে আর ডিজাইন দেখে আমাদের প্রত্যেকেরই কলার স্বাদ নেবার ইচ্ছে জাগলো। আমরা সবাই এক এক কামড়ে কলাটির স্বাদ নিলাম। কলাটির প্রথম কামড়ে আমার অনেকটা আটি কলার মতো মনে হলো যাকে আমাদের গ্রামে আইট্টা কলা বলা হয়ে থাকে। পরবর্তীতে কলাটি মুখের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের পরিচয় দিলো। কখনো মনে হলো কলাটির স্বাদ সাগর কলার মতো, মাঝে মাঝে মনে হলো কলার স্বাদ চাম্পা কলার মতো। আবার কখনো মনে হলো কলাটির স্বাদ বাংলা কলার মতো। তবে যেটাই হোক কলার স্বাদটা আমার কাছে যথেষ্ট অকল্পনীয় মনে হচ্ছিলো।
যেহেতু আমরা দেরী হবার কারণে কোথাও ঘুরতে যেতে পারিনি, আমি তাই ভাবলাম হোটেলের মধ্যেই নিজেদের ফটোসেশনের কাজটি করলে মন্দ হয়না। এতে করে সুন্দর কিছু মুহূর্তু সংরক্ষণ করা যাবে এবং না ঘুরতে পারার কষ্টটাও লাগব করা যাবে। যাই হোক দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানের মতো ভাবনা আরকি। অনেকক্ষন ধরে নিজেদের সুন্দর মুহুর্ত আমার ক্যামেরায় ক্যাপচার করার পর এবং গল্প গুজব করার পর আমাদের রাতের খাবারের সময় ঘনিয়ে আসলো।




বাম দিক থেকে- আসিফ, জাকির ভাই, মিসেস জাকির, মিসেস আসিফ , আরফা, জাকির ভাইয়ের মামি, দুলকার, মিসেস দুর্জয়, জোহাইরা, আমি, হাফিজ
রাত্র ঠিক ১০ টায় আমরা সবাই হোটেল গাইরিংয়ের ডাইনিংয়ে উপস্থিত হয়েছিলাম। আমাদের সবার; আগে থেকেই রাতে খাবারের অর্ডার দেয়া ছিলো । মোট নয়জনের জন্য পাঁচটি দেশী মুরগি এবং চারটি রুই মাছের অর্ডার দেয়া হয়েছিলো। সাথে করে একটি করে আলুভর্তা আর সবজি-ডাল। হোটেলটি দেশী মুরগির পিস ছিল ১৫০ টাকা করে এবং রুই মাছের পিস ছিলো ৯০ টাকা করে। প্রায় ১,৯০০ টাকা খরচে আমাদের রাত্রের খাবার গ্রহন করার পর আমরা সবাই নিজ নিজ রুমে ফিরে যাই। আর এভাবেই আমাদের ভ্রমণের প্রথম দিনটি শেষ হয়।
আমাদের পরেরদিনের পরিকল্পনা ছিলো সাজেক ভ্যালীতে যাবার। যেহেতু সাজেক ভ্যালী হোটেল গাইরিং থেকে প্রায় ৬৬.৬৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত, আমাদের খুব ভোরে রওয়ানা দিতে হবে। কারণ আমাদের মাথায় ব্যাপারটি ছিলো যে পাহাড়ের রাস্তায় ৬৬.৬৬ কিলোমিটার নরমাল রাস্তার চেয়ে পাঁচগুন কষ্টের। আমরা কীভাবে পরবর্তী দিন সাজেকে পৌছেছিলাম এবং সাজেকের সর্বোচ্চ কংলাক পাহাড়ে পৌছেছিলাম তা জানতে পরবর্তী ব্লগের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
ততক্ষনে আপনার সবাই ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন।
আল্লাহ হাফেজ!














