২০ ফেব্রুয়ারি ২০২১
গতকাল রাতেই আমাদের পরিকল্পনা হয়েছিলো খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠতে হবে। হোটেলে নাস্তা অর্ডার দেবার সময়, হোটেল কর্তৃপক্ষকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম সকাল ৮টার পূর্বে কোনমতেই নাস্তার ব্যবস্থা হবেনা। এজন্য আমাদের সবার পরিকল্পনা ছিলো একবারে তৈরি হয়ে সকালের নাস্তা খেতে নামবো। কারণ আমাদের চান্দের গাড়ির চালক জ্যাকি ভাইয়ের সাথে কথা হয়েছিলো সকাল ৮ টা ৩০ এর মধ্যে বের হতে হবে।
To find this blog in English; click the link below: https://iamnrdurjoy.wordpress.com/2021/05/07/nrds-tour-057-english/
সকাল ঠিক ৭ টা ৫৬ মিনিটে আমরা ৯ জন সকালের নাস্তা সারার জন্য হোটেলের রেস্টুরেন্টে গিয়েছিলাম। নাস্তা খেতে যেয়ে প্রচুর মানুষের ভিড় দেখে আমাদের আর বুঝতে বাকি রইলো না যে ঐদিন হোটেলে প্রচুর ভিড় ছিলো। আর তাই আমি, জাকির ভাই আর হাফিজ মিলেই নিজেদের নাস্তা নিজেরা পরিবেশণ করি। ঐদিন ওখানে একটা মজার ঘটনা ঘটেছিলো। জাকির ভাই আর আমাদের খাবার পরিবেশণ করা দেখে কোন কোন পর্যটক আমাদের হোটেলের লোক ভেবে বসে। ব্যাপারটা খুব হাস্যকর কিন্তু মজারও বটে।
সকালের নাস্তা সেরে তড়িগড়ি করে ব্যাগ গুছিয়ে আমরা সবাই চান্দের গাড়িতে করে সাজেকের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছিলাম। চান্দের গাড়ির চালক জ্যাকি ভাইয়ের সাথে আগেই কথা বলা ছিলো আর তাই উনি ঠিক ৮ টার মধ্যেই হোটেল গাইরিংয়ে এসে হাজির। পাহাড়ি ভাইটির এই সময়ানুবর্তিতা সত্যিই অনেক ইর্ষণীয়।
আমরা হোটেল গাইরিংয়ে আমাদের ভাড়া করা ২ টি কাপল রুম এবং ২ টি ডাবল রুমের মধ্যে ১ টি কাপল রুম এবং ১ টি ডাবল রুম রেখে বাকি ২ টি চেক আউট করি। আসলে আমাদের ২ টি রুম রাখার মূল কারণ ছিলো যাতে করে পরেরদিন হোটেলে এসে ফ্রেশ হতে পারি।
তো যাই হোক সকাল ৮ টা ৩০ এর জায়গায় ঠিক ৮ টা ৫৪ মিনিটে আমরা চান্দের গাড়িতে করে সাজেক ভ্যালীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছিলাম। খাগড়াছড়ির পাহাড়ি রাস্তার দুই পাশের সৌন্দর্য আমাকে সত্যিই বিমোহিত করছিলো। প্রায় ১ ঘন্টা ৮ মিনিট পর আমরা ঠিক ১০ টা ৯ মিনিটে সাজেকে প্রবেশ করার চেকপোস্টে হাজির হই। আঞ্চলিকভাবে সাজেকে প্রবেশ করার এই জায়গাটিকে বাঘাইহাট বলা হয়। ওখান থেকে সাজেক ভ্যালী প্রায় ৩৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
সাজেকে প্রবেশ করা এবং বের হবার কিছু নিয়ম কানুন আছে যেগুলো আপনাদের সাথে শেয়ার করছি। মূলত দিনের ২ টি সময়ে সাজেকে প্রবেশ করা এবং বের হওয়া যায়। প্রথমটি হচ্ছে সকাল ১০ টা থেকে ১০ টা ৩০ মিনিটের মধ্যে। আরেকটি হচ্ছে বিকেল ৩ টা থেকে ৩ টা ৩০ মিনিটের মধ্যে। এই দুই সময়ে সাজেক ভ্যালির একপাশ থেকে সাজেকে গাড়িগুলো প্রবেশ করে আরেকপাশ দিয়ে সাজেক থেকে গাড়িগুলো বের হয়।
আমরা যথানিয়ম অনুযায়ী দিঘীনালায় কর্তব্যরত সেনাবাহিনীদের আমাদের ১২ জন ভ্রমণকারীর তথ্য দিয়ে আসি। মূলত এ কারণেই বাঘাইহাটে সাজেকের চেকপোস্টে অপেক্ষা করতে হয়। সকল গাড়ি এবং ভ্রমণকারীদের তথ্য সংরক্ষণ করার পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একদল গাড়িগুলোর সামনে থাকে আরেকদল গাড়িগুলোর পিছনে থেকে, অনেকটা গার্ড দিয়ে সাজেকের উদ্দেশ্যে নিয়ে যায়।
প্রায় ২ ঘন্টা ৩০ মিনিটের পাহাড়ি রাস্তায় ভ্রমণের পর অবশেষে আমরা সাজেকে প্রবেশ করি। হোটেল গাইরিং থেকে মোট চার থেকে সাড়ে চার ঘন্টার পাহাড়ি ভ্রমণের পর আমরা সবাই আমাদের গন্তব্যস্থল সাজেকে পৌঁছােই। সাজেকে প্রবেশের পর আমাদের বুকিং করা মেঘ ভিউ পয়েন্ট রিসোর্টটি পেতে যথেষ্ট বিপাকে পড়তে হয়। হোটেল মেঘ ভিউ পয়েন্ট রিসোর্টটি মূলত সাজেক ভ্যালী থেকে কংলাক পাহাড়ের দিকে যেতে অবস্থিত। আপনাদের সাথে আমাদের সাজেক ভ্যালীতে থাকার রিসোর্টটি সম্পর্কে কিছু তথ্য শেয়ার করছি।
হোটেল মেঘ ভিউ পয়েন্ট রিসোর্টটি বেজমেন্টসহ দুইতলার একটি ইকো রিসোর্ট। এ হোটেলে মোট ৮ টি রুম রয়েছে যার প্রত্যেকটি ডাবল বা যুগ্ন রুমের। প্রত্যেকটির ভাড়া ৫,০০০ টাকা করে (সময় এবং চাহিদা অনুযায়ী হোটেলের ভাড়া পরিবর্তন হতে পারে) । নিচের তলার রুমগুলোর মাঝখান দিয়ে সামনের দিকে গেলে একটি মাঁচা পাওয়া যায় যেখানে বসে, শুয়ে এবং দাড়িয়ে যেকোন পর্যটক ভোরবেলার এবং সন্ধ্যাবেলার নৈসর্গিক মেঘের ভিউ উপভোগ করতে পারবেন। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, হোটেলটির বেজমেন্টে খাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।ঔখানটাতেই হোটেলের সরাইখানা রয়েছে।
হোটেল মেঘ ভিউ পয়েন্ট রিসোর্টে পৌছে আমরা সবাই যে যার রুমে অবস্থান করি। আমার রুমটি ছিলো নিচতলাতে যার পাশেই মূলত মাঁচাটি অবস্থিত। ঐ রুমটি থেকে খুব সহজে এবং খুব সুন্দরভাবে সাজেক ভ্যালির নৈসর্গিক দৃশ্য উপভোগ করা যায়।
যে যার রুমে গিয়ে ফ্রেশ হবার পর ঠিক ২ টা ২০ মিনিটে হোটেলটির বেইজমেন্টে খাবার টেবিলে অবস্থান করি। ঐদিন হোটেল থেকে আমাদের জন্য কমপ্লিমেন্টারি মধ্যাহ্নভোজের ব্যবস্থা করা হয়। তাদের প্যাকেজে ছিলো মুরগি, ডাল এবং আলুভর্তা। কিন্তু আমরা এক্সটা করে দুইটি ব্যামবো চিকেন অর্ডার করি। ব্যামবো চিকেন মূলত বাঁশের মধ্যে রান্না করা মুরগির মাংস। আমি বাবুর্চির কাছে গিয়ে ব্যামবো চিকেনের রেসিপি জানার চেষ্টা করি। তিনি আমাকে ব্যামবো চিকেন সম্পর্কে যা বলে তার সারাংশ হলো, ১ টি ব্যামবো চিকেনে একটি পুরো মুরগিকে এবং অন্য সব মশলা এবং উপাদানকে কুঁচি করা হয়৷ কুঁচি করার পর একসাথে সমস্ত কিছুকে ভালোভাবে মিশিয়ে নিয়ে কলাপাতার মধ্যে মোড়ানো হয়। কলাপাতার মোড়ানোর পর বাঁশের মধ্যে তা প্রবেশ করানো হয়। বাঁশের মধ্যে মুড়িয়ে রাখার পর মাঝারি আঁচের আগুনের কয়লার মধ্যে রাখা হয়। প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিনিট রাখার পর বাঁশটি যখন পুড়ে কালো হয়ে যায় এবং মাংসের একটা গন্ধ আসে, তখন চুলা থেকে উঠিয়ে নিয়ে গরম গরম ব্যামবো চিকেন পরিবেশণ করা হয়।
খাবারের কথা বলতে ঐদিন ব্যামবো চিকেনটি যথেষ্ট আলাদা ছিলো। প্রত্যেকটি ব্যামবো চিকেনের দাম ছিলো ৫০০ টাকা করে। ঝাঁল ছিল প্রচুর। যারা ঝাঁল খেতে পছন্দ করেন তাদের জন্য একটি পছন্দের খাবার হতে পারে ব্যামবো চিকেন।
দুপুরের খাবার সেরে আমরা সবাই তৈরি হয়ে থাকি। আর আমি ঐদিকে চান্দের গাড়ির চালক জ্যাকি ভাইকে ফোন দিয়েছিলাম। ঠিক ৩ টা ৫০ মিনিটে আমরা সবাই একসাথে কংলাক পাহাড়ের উদ্দেশে রওয়ানা দিয়েছিলাম। যেহেতু কংলাক পাহাড় আমাদের রিসোর্ট থেকে মাত্র ১ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত, আমাদের কংলাক পাহাড়ে যেতে খুব বেশি সময় লাগেনি। আমার ঐদিনের অভিজ্ঞতা যথেষ্ট ভিন্ন ছিলো। কারণে আমি আমার এক হাতে ছেলেকে কোলে নিয়ে আরেক হাতে একটি লাঠি নিয়ে পাহাড়ের চুড়ায় উঠেছিলাম।
পাহাড়ে উঠতে গিয়ে প্রত্যেক পর্যটকদের একটি ছোট বাঁশের কঞ্চি নিয়ে উঠতে হয়। কারণ বাঁশের কঞ্চিটি ভারসম্য রাখতে যথেষ্ট সাহায্য করে। বয়সভেদে বাঁশের কঞ্চিগুলোর দাম ৫ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২০ টাকা হয়ে থাকে।
হাফিজ ছাড়া আমাদের প্রত্যেকের কোলেই একটি করে বাচ্চা ছিলো যার কারণে একেবারে পাহাড়ের শিখরে ওদের নিয়ে উঠার সাহস পাই নি। এজন্য আমাদের স্ত্রীগণকে উপরে উঠার সুযোগ করে দিয়ে আমি, আসিফ আর জাকির ভাই বাবুদের নিয়ে স্থানীয় একটি দোকানে ওদের নামার অপেক্ষা করতে থাকি। আমরা এদিকে পাহাড়ি কলা আর রংচা উপভোগ করতে থাকি।
কিছুক্ষণ পর জাকির ভাই এবং আসিফের স্ত্রীগণ কংলাক পাহাড়ে উপভোগ করার পর নিচে চলে আসে। আমার স্ত্রী অতিরিক্ত আনন্দে নিচেই নামতে চাচ্ছিলো না। আমি পড়লাম এক মহা বিপাকে। দুলকারকে নিয়ে দোকানের বসে ঝিমুচ্ছিলাম আর ভাবছিলাম চান্দের গাড়িতে ফিরে যাবো কিনা। পড়ে ভাবলাম রাগ করে থাকলে নিজেরই লোকসান। সাজেকের মতো জায়গায় এসেছি, আরকি আসা হবে? দিনকেদিন যেভাবে পর্যটক বাড়ছে, হয়ছে বর্তমান সৌন্দর্য ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাবে।
ভাবতে ভাবতে হঠাৎ দেখি আমার স্ত্রী বাঁশের কঞ্চি একটা হাতে নিয়ে নিচে নেমে এসেছে। আমিতো তাকে দেখে মহা এক্সাইটেড। তাড়াতাড়ি দুলকারকে ওর কোলে দিয়ে আমি লাঠি নিয়ে উপরে চলে যাই। উপরে যেতে যেতে দেখি, যতো উপরের দিকে উঠতে থাকি পাহাড়টি ততোটাই বিপজ্জনক। ভালোই হয়েছে দুলকারকে এতো উপরে নিয়ে আসিনি। কারণ আমার আবার এক্রোফোবিয়া আছে। একবান যদি উপরের দিকে উঠতে গিয়ে নিচের দিকে তাকাই তাহলে বিপদে পরা অনেকটাই সুনিশ্চিত।
এগুলা ভাবতে ভাবতে উপরের দিকে উঠতে গিয়ে দেখি জাকির ভাইদেরকে অনেক দূর থেকে দেখা যাচ্ছে। কংলাক পাহাড়ের সাইনবোর্ডটির সামনে একটি সেলফি তুলে আমি সরাসরি জাকির ভাইদের কাছে চলে যাই৷ ওখানে গিয়ে অনেক ফটো, সেলফি তুলে আমরা সবাই অনেক সময় উপভোগ করি। সত্যিই কংলাক পাহাড়ে কাটানো আমার মুহূর্তগুলো অনেক মজার ছিলো।
কংলাক পাহাড়ে অনেক ভালো মুহুর্ত উপভোগ করার পর আমরা সবাই সন্ধ্যা ৫ টা ৫৭ মিনিটে সাজেকের পুরাতন হেলিপ্যাডে যাই। বন্ধের দিন থাকায় ঐদিন হেলিপ্যাডে অনেক ভিড় ছিলো। আমরা সবাই ওখানে গিয়ে ওখানকার জনপ্রিয় ব্যামবো টি উপভোগ করি। এটি ওখাকার জনপ্রিয় একটি খাবার। মূলত চা-কে নরমালি বানিয়ে বাঁশের মধ্যে পরিবেশন করা হয়। নতুনভাবে পরিবেশন করা ঐ চা খেয়ে আমার যথেষ্ট ভালো লেগেছে। ও হ্যাঁ আপনাদের সাথেতো শেয়ার করাই হয়নি৷ প্রতি কাপ ব্যামবো টি ২০ টাকা করে পাওয়া যায়। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে দুধ, চা হোক আর রং চা, সকল ধরণের চায়ের দাম একই।
সাজেক পুরাতন হেলিপ্যাডে কিছু সুন্দর মুহূর্ত উপভোগ করার পর আমরা ঠিক ৬ টা ২০ মিনিটে আমাদের হোটেলে গিয়ে পৌঁছাই।ওখানে গিয়ে দেখি, আমাদের জন্য বারবিকিউ পার্টির আয়োজন করা হচ্ছিলো। বারবিকিউ পার্টির আমেজে আমরা সবাই হোটেলের ডাইনিংয়ে গিয়ে জড়ো হই। বারবিকিউ বানানোর জন্য আগে থেকেই হোটেল কর্তৃপক্ষকে জানাতে হয়। প্রতি পিস চিকেন বারবিকিউয়ের দাম ১৫০ টাকা।
সন্ধ্যার নাসতা সেরে আমরা সবাই আবার গল্প গুজবে মেতে থাকি। আমার স্ত্রী সবার জন্য মজাদার থাই গ্রাস দিয়ে চা পরিবেশন করে। একপর্যায়ে আমরা সবাই মজাদার গল্পে মেতে উঠি। গল্প করতে করতে কখন যে সময় শেষ হয়ে যায় ভাবতেই পারিনি।
গল্প করার এক পর্যায়ে হোটেল কর্তৃপক্ষ আমাদের রাতের খাবার গ্রহণ করার জন্য ডাকে। আমরা সবাই রাত ১০ টা ৫ মিনিটে পুনরায় হোটেলের ডাইনিংয়ে মিলিত হই। এবার আমাদের রাতের খাবারের রেসিপি ছিলো ব্রয়লার মুরগির সাথে ডাল, পাহাড়ি কুমড়া সবজি এবং আলুভর্তা। ওই হোটেলে একএকটি মুরগির পিসের দাম প্রায় ১০০ টাকা।

রাতের খাবারের শেষে আমরা সবাই যে যার রুমে চলে যাই। আমাদের সবারই পরিকল্পনা ছিলো পরেরদিনের সাজেকের ভোরের সূর্য উপভোগ করবো। অনেকখানি আনন্দ আর একটুখানি চিন্তার জন্য কখনযে রাতে ঘুমিয়ে গিয়েছি তার হিসেব ছিলো না।
আর এভাবেই আমাদের ভ্রমণের ২য় দিন কেটে গেলো। আগামি ব্লগে আপনাদের সাথে শেয়ার করবো কিভাবে আমরা সাজেক ভ্যালি থেকে চান্দের গাড়ি করে খাগড়াছড়ির হোটেল গাইরিংয়ে পৌঁছাই। কিভাবে হোটেল গাইরিং থেকে চট্টগ্রাম শাহ আমানত হয়ে ঢাকা শাহ জালাল বিমানবন্দরে গিয়ে পৌছে আমাদের ভ্রমণের শেষ হয়।
ততক্ষণ পর্যন্ত আপনারা সবাই ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাসিখুশি থাকবেন।
আল্লাহ হাফেজ!!!!





































