লেখক: মো: নাইমুর রহমান (দুর্জয়)
রূপবৈচিত্র্য ও ইতিহাসের মেলবন্ধনে ঘেরা বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের সীমান্তবর্তী জেলা ঠাকুরগাঁও । এই প্রাচীন জনপদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ এবং ঐতিহাসিক কীর্তি হলো হরিপুর উপজেলার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত হরিপুর রাজবাড়ি (যা স্থানীয়ভাবে হরিপুর জমিদার বাড়ি নামেও অত্যন্ত পরিচিত) । এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রাসাদটি তার দৃষ্টিনন্দন কারুকার্য এবং সমৃদ্ধ ইতিহাসের কারণে প্রত্নতত্ত্ব অনুরাগী ও ভ্রমণপিপাসুদের নিয়মিত আকর্ষণ করে চলেছে ।
১) পরিচিতি (Introduction)
ঠাকুরগাঁও জেলা সদর থেকে প্রায় ৫০ থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে হরিপুর উপজেলার কেন্দ্রস্থলে ৩ একর ২৭ শতক জমির ওপর এই সুবিশাল ও ঐতিহাসিক রাজবাড়িটি দাঁড়িয়ে রয়েছে । এটি বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা । একসময় এই জমিদার প্রাসাদে ছিল জমিদারি পরিচালনার কাচারি, বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়, বিনোদনের জন্য নাচমহল ও নাগমহল, অন্ধকার অন্ধকূপ এবং একটি সমৃদ্ধ পাঠাগার । দেশভাগের পর জমিদার বংশের উত্তরসূরিরা চলে যাওয়ার পর এটি দীর্ঘকাল পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল । বর্তমানে এটি উত্তরবঙ্গের অন্যতম দৃষ্টিনন্দন পর্যটন স্থান এবং হরিপুরের সমাজ প্রবর্তনের জীবন্ত দলিল হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ।
২) গুগল লোকেশন ও ভৌগোলিক অবস্থান (Google Location & Geography)
ভৌগোলিক দিক থেকে হরিপুর রাজবাড়িটি বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রংপুর বিভাগের ঠাকুরগাঁও জেলার সর্বপশ্চিমে অবস্থিত সীমান্ত উপজেলা হরিপুরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত । এর ভৌগোলিক সীমানা অত্যন্ত চমৎকার:
উত্তর-পূর্বে: ঠাকুরগাঁও জেলার রাণীশংকৈল উপজেলা ।
দক্ষিণ-পশ্চিমে: ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য (সীমান্তবর্তী এলাকা) ।
সড়কপথের দূরত্ব: ঢাকা থেকে হরিপুর রাজবাড়ির দূরত্ব সড়কপথে প্রায় ৩২১.৮৬ কিলোমিটার এবং ঠাকুরগাঁও জেলা শহর থেকে এর দূরত্ব মাত্র ৪০.০৬ কিলোমিটার ।
সীমান্তবর্তী হিমালয় পর্বতের পাদদেশীয় সমতলভূমিতে অবস্থিত হওয়ায় এখানকার প্রকৃতি ও আবহাওয়া অত্যন্ত মনোরম, যা শীতকালে এক কুয়াশাচ্ছন্ন অপূর্ব রূপ ধারণ করে ।

৩) রাজবাড়ির আদি ইতিহাস (History)
হরিপুর রাজবাড়ির গোড়াপত্তন এবং এই অঞ্চলের জমিদারি প্রতিষ্ঠার ইতিহাস অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক এবং দীর্ঘ:
কুণ্ডু বংশের আগমন ও জমিদারি লাভ:
মুসলিম শাসনামলে আনুমানিক ১৪০০ খ্রিস্টাব্দে ঘনশ্যাম কুণ্ডু নামক একজন কাপড়ের ব্যবসায়ী এন্ডি কাপড়ের ব্যবসা করার উদ্দেশ্যে হরিপুরে আসেন । তৎকালীন সময়ে এই অঞ্চলের জমিদার ছিলেন মেদিনীসাগর গ্রামের মেহেরুন্নেসা (বা মেহেরুন নেসা) নামের এক বিধবা ও অপুত্রক মুসলিম নারী । তাঁর এই জমিদারির খাজনা দিতে হতো তাজপুর পরগনার ফৌজদারের অধীনে । কোনো এক সময়ে খাজনা অনাদায়ের কারণে মেহেরুন্নেসার জমিদারির কিছু অংশ নিলামে উঠলে ব্যবসায়ী ঘনশ্যাম কুণ্ডু তা কিনে নেন এবং এভাবেই এ অঞ্চলে কুণ্ডু বংশের জমিদারি প্রতিষ্ঠিত হয় ।
রাজবাড়ির নির্মাণ পর্ব:
ঘনশ্যাম কুণ্ডুর বংশধরদের একজন, রাঘবেন্দ্র রায় চৌধুরী, ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে (১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দে) ব্রিটিশ আমলে বর্তমান এই প্রাসাদোপম রাজবাড়িটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও নির্মাণকাজ শুরু করেন । তবে রাঘবেন্দ্র রায় তাঁর জীবদ্দশায় প্রাসাদের কাজ সমাপ্ত করতে পারেননি । রাঘবেন্দ্র রায়ের মৃত্যুর পর তাঁর সুযোগ্য পুত্র জগেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এসে এই বিশাল রাজবাড়ির নির্মাণকাজ সফলভাবে সমাপ্ত করেন বিভিন্ন জনহিতকর ও সামাজিক কাজের জন্য ব্রিটিশ সরকার জগেন্দ্র নারায়ণ রায়কে সম্মানজনক “রাজর্ষি” (বা রাজা) উপাধিতে ভূষিত করেছিল ।
বড় তরফ ও ছোট তরফ বিভাজন:
১৯০০ সালের দিকে (কিংবা ১৯০৩ সালে) ঘনশ্যাম কুণ্ডুর বংশধররা অভ্যন্তরীণভাবে বিভক্ত হয়ে যান । এর ফলে হরিপুর রাজবাড়িটি দুটি অংশে বিভক্ত হয়ে পড়ে:
১. বড় তরফ: রাঘবেন্দ্র রায় ও জগেন্দ্র নারায়ণ রায় কর্তৃক নির্মিত আদি রাজবাড়িটি বড় তরফের রাজবাড়ি নামে পরিচিতি পায়। পরবর্তীতে জগেন্দ্র নারায়ণের দুই ছেলে রবীন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী ও বিশ্বেন্দ নারায়ণ রায় চৌধুরী এখান থেকে জমিদারি পরিচালনা করতেন ।
২. ছোট তরফ: বড় তরফের রাজবাড়ির ঠিক পশ্চিম পাশে ১৯০৩ সালে নগেন্দ্র বিহারী রায় চৌধুরী ও গিরিজা বল্লভ রায় চৌধুরী (মতান্তরে নগেন্দ্র নারায়ণ ও সিরিজা নারায়ণ অথবা রমেন্দ্র কৃষ্ণ ও গিরিজা বল্লভ) আরেকটি নতুন প্রাসাদ নির্মাণ করেন, যা ছোট তরফ নামে পরিচিতি লাভ করে ।

৪) রহস্য ও অজানা তথ্য (Mysteries & Unknown Facts)
হরিপুর রাজবাড়ির দেয়ালে দেয়ালে জড়িয়ে আছে অনেক রহস্যময় ও অজানা ঐতিহাসিক ঘটনা:
রাজর্ষি উপাধির নেপথ্য কারণ: ব্রিটিশ সরকার সাধারণত নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য এদেশীয় সামন্তপ্রভুদের খুশি করতে বিভিন্ন উপাধি দিত। জগেন্দ্র নারায়ণকেও হয়তো সেই উদ্দেশ্যে উপাধি দেওয়া হয়েছিল, তবে তাঁর বিদ্যানুরাগ, সমৃদ্ধ পাঠাগার স্থাপন এবং শিল্প-সংস্কৃতি চর্চার প্রতি গভীর আগ্রহও এই অনন্য উপাধি পাওয়ার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছিল ।

ইংরেজ রাজার স্মারক মূর্তি: ১৯১১ সালে ইংল্যান্ডের রাজা পঞ্চম জর্জের ভারত আগমনকে স্মরণীয় করে রাখতে জমিদার জগেন্দ্র নারায়ণ রায় প্রাসাদের পূর্ব দেয়ালের শীর্ষে নিজের ১৪টি আবক্ষ মূর্তি ও প্রতিকৃতি নির্মাণ করিয়েছিলেন, যা স্থাপত্যশিল্পে এক বিরল নিদর্শন ।
প্রমোদপ্রিয় গিরিজা বল্লভ বনাম ঘরকুনো রমেন্দ্র: ছোট তরফের দুই ভাই চরিত্রের দিক থেকে ছিলেন সম্পূর্ণ বিপরীত। রমেন্দ্র কৃষ্ণ রায় চৌধুরী ছিলেন অত্যন্ত ঘরকুনো স্বভাবের, অন্যদিকে গিরিজা বল্লভ রায় চৌধুরী ছিলেন অত্যন্ত আমুদে ও প্রমোদপ্রিয়। তিনি গান-বাজনা, নাচ এবং খেলাধুলা খুবই পছন্দ করতেন ।
জলসাঘর ও ফাঁসির অন্ধকূপ: রাজবাড়ির পেছনের একটি বিশেষ ভবন একসময় “জলসাঘর” বা নাচমহল হিসেবে ব্যবহৃত হতো, যেখানে রাজকীয় বিনোদনের আয়োজন করা হতো । আবার রাজবাড়ির অন্দরে একটি অন্ধকার অন্ধকূপ ছিল, যেখানে জমিদারি আমলে বিদ্রোহী কৃষক বা সাধারণ মানুষদের এনে নির্মমভাবে ফাঁসি বা শাস্তি দেওয়া হতো বলে লোকমুখে প্রবল জনশ্রুতি রয়েছে ।
৫) সাইটের কাঠামো, স্থাপত্য ও বিশেষত্ব (Structure & Architecture)
হরিপুর রাজবাড়ির নিখুঁত স্থাপত্যশৈলী তৎকালীন রাজকীয় রুচি ও নিখুঁত নির্মাণ কৌশলের পরিচয় বহন করে:
মূল প্রাসাদ ও কারুকার্য:
প্রাসাদের দ্বিতল ভবনের দেয়াল জুড়ে চমৎকার লতাপাতা, ফুল ও বিচিত্র মানব মূর্তির নকশা খচিত রয়েছে । বড় তরফ ভবনের পূর্ব দেয়ালের শীর্ষে জমিদার জগেন্দ্র নারায়ণের ১৪টি আবক্ষ মূর্তি এখনো দৃশ্যমান । তবে অযত্নে এর অনেক চমৎকার কারুকার্য এখন বিলুপ্তপ্রায় । প্রাসাদের প্রধান আকর্ষণীয় “সিংহদরজা” বা সিংহদ্বারটি কালের বিবর্তনে এখন সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে ।
৪০০ বছরের প্রাচীন টেরাকোটা শিব ও নাটমন্দির:
বড় তরফ রাজবাড়ির পূর্ব পাশে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও প্রায় ৪০০ বছরের পুরনো একটি ঐতিহাসিক শিব মন্দির এবং তার সামনে নাটমন্দির (বা নাট্যশালা) রয়েছে ।

নির্মাণশৈলী: মন্দিরটি প্রাচীন বাংলার ঐতিহ্যবাহী ‘জোড়বাংলা’ পদ্ধতিতে নির্মিত । এর ছাদটি দেখতে অনেকটা ছাতা আকৃতির ও আটচালা বিশিষ্ট এবং দেয়ালগুলো আট কোণবিশিষ্ট।
টেরাকোটা নকশা: মন্দিরের দেয়াল জুড়ে চমৎকার লতাপাতা ও বিভিন্ন দেব-দেবীর মূর্তির টেরাকোটা নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল । মন্দিরের দক্ষিণ দিকে একটি প্রধান প্রবেশদ্বার এবং পূর্ব ও পশ্চিম দেয়ালে একটি করে ক্ষুদ্রাকৃতির জানালা রয়েছে । (উল্লেখ্য, এই প্রাচীন জরাজীর্ণ মন্দিরের সামনে পরবর্তীতে আরেকটি নতুন শিব মন্দির স্থাপন করা হয়েছিল ।
ভবনের অন্তরালে:
রাজবাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলে পেঁচানো সিঁড়ি বেয়ে ছাদে যাওয়া যায় বর্তমানে অবহেলার কারণে ছাদে বড় বড় উদ্ভিদের শ্যাওলা ও গাছের শিকড় ছড়িয়ে পড়েছে, যা প্রাসাদের জরাজীর্ণ রূপকে আরও ফুটিয়ে তোলে ।
৬) যেভাবে যাবেন, ভ্রমণ সময় ও খরচ (How to Go, Time & Cost)
ঢাকা থেকে ঠাকুরগাঁও এবং সেখান থেকে হরিপুর রাজবাড়িতে যাওয়ার যাতায়াত ব্যবস্থা অত্যন্ত সুগম ও সহজ:
ক) ঢাকা থেকে ঠাকুরগাঁও যাতায়াত:
ঢাকা থেকে ঠাকুরগাঁও যাওয়ার জন্য বাস ও ট্রেন—উভয় পথেরই চমৎকার সুবিধা রয়েছে:
১. বাস যাত্রা:
কোথায় পাবেন: ঢাকার শ্যামলী, কল্যাণপুর এবং গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন বিভিন্ন কোম্পানির বাস ঠাকুরগাঁওয়ের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় ।
পরিবহনসমূহ: হানিফ এন্টারপ্রাইজ, নাবিল পরিবহন, বাবলু এন্টারপ্রাইজ, কেয়া পরিবহন ও কর্ণফুলী পরিবহন।
ভ্রমণ সময়: সড়কপথে ঢাকা থেকে ঠাকুরগাঁও যেতে সাধারণত ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা সময় লাগে ]।
বাস ভাড়া: এসি ও নন-এসি বাসভেদে জনপ্রতি ভাড়া ৮০০ থেকে ১৮০০ টাকা ।
২. ট্রেন যাত্রা:
কোথায় পাবেন: ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে সরাসরি ঠাকুরগাঁওয়ের উদ্দেশ্যে ট্রেন ছেড়ে যায় ।
ট্রেনসমূহ: পঞ্চগড় এক্সপ্রেস, একতা এক্সপ্রেস এবং দ্রুতযান এক্সপ্রেস।
ভ্রমণ সময়: ট্রেনের টিকিট প্রাপ্তি ও শ্রেণীর ওপর নির্ভর করে এটি আরামদায়ক ভ্রমণ নিশ্চিত করে।
ট্রেন ভাড়া: আসন শ্রেণী অনুযায়ী ট্রেনের ভাড়া জনপ্রতি ৬৫০ থেকে ২২৩৭ টাকা (বা কোনো কোনো ক্লাসে সর্বোচ্চ ২৪৪৮ টাকা পর্যন্ত) হতে পারে ।
খ) ঠাকুরগাঁও থেকে হরিপুর রাজবাড়ি:
ঠাকুরগাঁও জেলা সদরে পৌঁছানোর পর সেখান থেকে বাস অথবা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা (ইজি-বাইক)-এর মাধ্যমে খুব সহজেই সরাসরি হরিপুর উপজেলার ঐতিহাসিক রাজবাড়িতে যাওয়া যায়।
৭) ভ্রমণের জন্য যেখানে থাকবেন ও খাবেন (Where to Stay & Eat)
হরিপুর একটি সীমান্ত উপজেলা হওয়ায় রাজবাড়ির আশেপাশে সরাসরি থাকার মতো ভালোমানের বড় হোটেল নেই, তবে খাওয়া ও রাতে যাপনের জন্য ঠাকুরগাঁও জেলা সদরে চমৎকার ব্যবস্থা রয়েছে:
থাকার ব্যবস্থা (ঠাকুরগাঁও শহর):
ঠাকুরগাঁও শহরের নর্থ সার্কুলার রোডে আরামদায়ক ও নিরাপদ যাপনের জন্য বেশ কিছু চমৎকার আবাসিক হোটেল রয়েছে :
১. হোটেল সালাম ইন্টারন্যাশনাল
২. হোটেল প্রাইম ইন্টারন্যাশনাল
৩. হোটেল শাহ্ জালাল
৪. হোটেল সাদেক
এছাড়াও সরকারি অনুমতি সাপেক্ষে আপনি সরকারি সার্কিট হাউস অথবা জেলা পরিষদের রেস্ট হাউসে রাত্রিযাপন করতে পারেন ।
খাবারের ব্যবস্থা:
হরিপুরের রাজবাড়ির কাছেই অবস্থিত আটঘারিয়া বাজার এবং পাঁচঘরিয়া বাজারে স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী খাবার, চা ও হালকা নাস্তা খাওয়ার জন্য ছোট ছোট দোকান ও ধাবা রয়েছে, যেখানে খাবারের মান বেশ ভালো এবং স্থানীয়দের আন্তরিকতাও প্রশংসনীয় ।
৮) বর্তমান অবস্থা (Current Status of the Rajbari)
হরিপুর রাজবাড়িটি দীর্ঘকাল ধরে অবহেলা ও অযত্নের শিকার হলেও বর্তমানে এটি সংরক্ষণের জন্য সরকারিভাবে বড় ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে:
জরাজীর্ণ ও পরিত্যক্ত দশা: দীর্ঘকাল সংস্কার না করায় ২০২০ সালের ভারী বর্ষণের ফলে রাজবাড়ির ছাদ ও দেয়ালের কিছু অংশ ধসে পড়েছিল । ভবনটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও এখনো কিছু পরিবার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এর কিছু কক্ষে বসবাস করছে ।
স্থানীয় যুবসমাজের প্রতিবাদ ও মানববন্ধন: রাজবাড়িটি ধসে পড়া এবং ধ্বংস হওয়া থেকে রক্ষা করতে স্থানীয় সচেতন যুবসমাজ, শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী মানববন্ধন ও লিফলেট বিতরণের মাধ্যমে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন ।

সরকারি সংস্কার কাজ: ইতিপূর্বে ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ সরকার এটি সামান্য সংস্কার করেছিল । পরবর্তীতে ২০২২ সালের ২০শে নভেম্বর থেকে ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসকের বিশেষ উদ্যোগে এবং ‘গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ কর্মসূচি’র আওতায় প্রথম ধাপের সংস্কার কাজ জোরেশোরে শুরু হয় । প্রাসাদের জঙ্গল ও শ্যাওলা পরিষ্কার করে দেয়ালে রঙের প্রলেপ দেওয়া হয়েছে ।
দখলমুক্তকরণ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকার কারণে রাজবাড়ির কক্ষগুলো স্থানীয় মহিলা সমিতি, ভূমি অফিসার্স সমিতিসহ বিভিন্ন সংগঠনের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হতো । বর্তমানে সরকারি সংস্কার কাজ শুরু হওয়ায় এই অফিসগুলো অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে । স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন যে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এই স্থানটি পরিদর্শন করেছে এবং একে উত্তরবঙ্গের একটি অন্যতম ও আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য আবেদন করা হয়েছে ।
ভ্রমণকারীদের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ টিপস:
১. রাজবাড়িটি বর্তমানে জরাজীর্ণ ও সংস্কারাধীন অবস্থায় রয়েছে, তাই এর বিভিন্ন তলায় বা ঝুঁকিপূর্ণ ছাদে ওঠার সময় অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করুন ।
২. আমাদের প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ দেশের গৌরব। তাই প্রাসাদের দেয়ালে কিছু লেখালেখি করা, প্লাস্টিক বা আবর্জনা ফেলে পরিবেশ নোংরা করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকুন।
৩. যেকোনো দূরপাল্লার ভ্রমণের আগে হোটেল বুকিং ও যাতায়াত খরচ পরিবর্তনশীল হতে পারে বিধায় বর্তমান তথ্যাদি ভালোভাবে যাচাই করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে ।

Leave a comment