লেখক: মো: নাইমুর রহমান (দুর্জয়)
১) পরিচিতি
রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর ঐতিহাসিক কেন্দ্রে অবস্থিত রেড স্কয়ার (রুশ ভাষায়: Krasnaya ploshchad’ বা Красная площадь) ইউরোপ মহাদেশ তথা সমগ্র বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন, বৃহত্তম ও বিখ্যাত গণচত্বর। এটি মস্কো ক্রেমলিনের পূর্ব দেয়াল ঘেঁষে এবং মস্কভা নদীর উত্তরে অবস্থিত। এই চত্বরটি ক্রেমলিন (রাশিয়ার রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন) এবং ঐতিহাসিক কিতাই-গোরোদ (Kitai-gorod) বাণিজ্য এলাকাকে পৃথক করেছে। আয়তনের দিক থেকে এটি প্রায় ৭৩,০০০ বর্গমিটার (৮,০০,০০০ বর্গফুট), যা দৈর্ঘ্যে প্রায় ৩৩০ মিটার এবং প্রস্থে ৭০ মিটার। ১৯৯০ সালে ইউনেস্কো (UNESCO) রেড স্কয়ার এবং ক্রেমলিনকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান (World Heritage Site) হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
২) গুগল লোকেশন ও ভৌগোলিক অবস্থান
- ভৌগোলিক স্থানাঙ্ক (Coordinates): ৫৫°৪৫′১৫″ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৩৭°৩৭′১২″ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ (55.75417° N, 37.62000° E)।
- অবস্থান: সেন্ট্রাল মস্কো, ক্রেমলিনের পূর্ব দেয়াল সংলগ্ন, উত্তরের স্টেট হিস্টোরিক্যাল মিউজিয়াম এবং রেজারেকশন গেট থেকে শুরু করে দক্ষিণে সেন্ট বাসিলস ক্যাথেড্রাল পর্যন্ত বিস্তৃত।

৩) ইতিহাস
- সূচনা ও প্রতিষ্ঠা: পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষের দিকে (১৪৯০-এর দশকে) মহান প্রিন্স তৃতীয় ইভান (Ivan III) ক্রেমলিনের সীমানা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেন। শত্রুর আক্রমণ থেকে সুরক্ষার জন্য ১৪৯৩ ও ১৪৯৫ সালের আদেশে ক্রেমলিনের পূর্ব দেয়ালের বাইরে থাকা কাঁচা ঘরবাড়ি ও বস্তি উচ্ছেদ করে ফাঁকা ফায়ারিং জোন তৈরি করা হয়, যা পরবর্তীকালে রেড স্কয়ারে পরিণত হয়।
- নামকরণের ইতিহাস: অতীতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার কারণে স্থানটি ‘পোঝার’ (Pozhar বা দগ্ধ স্থান) এবং ‘ভেলিকি তোর্গ’ (মহাহাট) নামে পরিচিত ছিল। ১৬৬১–১৬৬২ খ্রিষ্টাব্দে জার আলেক্সি মিখাইলোভিচের শাসনামলে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে একে ‘ক্রাসনায়া’ (Krasnaya) নাম দেওয়া হয়।
- স্থাপত্য ও রূপান্তর: ১৫৫৫ থেকে ১৫৬১ সালের মধ্যে জার ইভান দ্য টেরিবল কাজান খানাত জয়ের স্মারক হিসেবে ঐতিহাসিক সেন্ট বাসিলস ক্যাথেড্রাল নির্মাণ করেন। ১৬১২ সালে পোলিশ দখলদারদের বিতাড়িত করার পর স্মারক হিসেবে কাজান ক্যাথেড্রাল নির্মিত হয়।
- ১৯ শতক ও সোভিয়েত যুগ: ১৮১২ সালের নেপোলিয়ন আক্রমণের অগ্নিকাণ্ডের পর ১৮১৩ সালে এখানকার প্রাচীন পরিখা (Alevizov moat) ভরাট করে ফেলা হয়। ১৮১৮ সালে মিনিন ও পোজারস্কির ব্রোঞ্জ মূর্তি স্থাপন করা হয় এবং ১৮৯৩ সালে গুম (GUM) শপিং মল নির্মিত হয়। সোভিয়েত যুগে এটি বিশাল সামরিক কুচকাওয়াজ ও রাজনৈতিক প্রদর্শনী কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ১৯২৯-১৯৩০ সালে লেনিনের সমাধি (Mausoleum) গড়ে ওঠে। ১৯৩০-এর দশকে প্যারেডের সুবিধার্থে রেজারেকশন গেট ও কাজান ক্যাথেড্রাল ভেঙে ফেলা হয়েছিল, যা পরবর্তীতে ১৯৯০-এর দশকে মূল নকশায় পুনর্নির্মাণ করা হয়।

৪) রহস্য ও অজানা তথ্য
- ‘লাল’ নয়, মূল অর্থ ‘সুন্দর’: ‘রেড স্কয়ার’ নামের সাথে কমিউনিজম বা লাল রঙের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। প্রাচীন রুশ ভাষায় ‘ক্রাসনায়া’ (Krasnaya) শব্দের মূল অর্থ ছিল ‘সুন্দর’ (Beautiful Square)।
- লবনোয়ে মেস্তো ও মৃত্যুদণ্ডের ভুল ধারণা: লবনোয়ে মেস্তো (Lobnoye Mesto) নামক বৃত্তাকার পাথরের মঞ্চটি নিয়ে সাধারণ ধারণা ছিল যে এখানে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতো; তবে প্রকৃতপক্ষে এটি জারদের অধ্যাদেশ পাঠ ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত হতো। প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হতো ক্যাথেড্রালের পেছনের ভাসিলেভস্কি স্পুস্কে।
- স্থপতিদের অন্ধ করে দেওয়ার জনশ্রুতি: লোককথা আছে যে জার ইভান দ্য টেরিবল সেন্ট বাসিলস ক্যাথেড্রালের স্থপতিদের অন্ধ করে দিয়েছিলেন যাতে তারা এরকম সুন্দর কিছু আর বানাতে না পারেন; তবে এটি ভুল প্রমাণিত হয়েছে কারণ জারের মৃত্যুর বহু বছর পরেও তারা কাজ করেছেন।
- স্ট্যালিনের সিদ্ধান্ত বদল: সোভিয়েত আমলে সামরিক কুচকাওয়াজের পথ প্রসারিত করতে স্ট্যালিনের সহযোগী কাগানোভিক সেন্ট বাসিলস ক্যাথেড্রাল ভেঙে ফেলার প্রস্তাব দিলে স্ট্যালিন তা নাকচ করে দেন এবং ক্যাথেড্রালটি ধ্বংসের হাত থেকে বেঁচে যায়।
- মাথিয়াস রাস্টের বিমান অবতরণ (১৯৮৭): ১৯৮৭ সালে ১৯ বছর বয়সী পশ্চিম জার্মান শৌখিন বৈমানিক মাথিয়াস রাস্ট এক ইঞ্জিনবিশিষ্ট সেসনা (Cessna) বিমানে সোভিয়েত আকাশ প্রতিরক্ষা বলয় ভেদ করে রেড স্কয়ারের কাছে অবতরণ করে বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিলেন।
- একটিমাত্র মূর্তি: সমগ্র রাশিয়ার প্রতীকী কেন্দ্র হওয়া সত্ত্বেও রেড স্কয়ারের প্রাঙ্গণে মাত্র একটি মূর্তি রয়েছে (মিনিন ও পোজারস্কির স্মারক মূর্তি)।
- লেনিনের মমি সংরক্ষণ: ১৯২৪ সালে মারা যাওয়ার পর লেনিনের মরদেহ বিশেষ কেমিক্যাল ও ব্লিচ দিয়ে প্রতি সপ্তাহে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে মমিরূপে কাচের সাকোফাগাসে প্রদর্শন করা হয়।
৫) সাইটের কাঠামো, স্থাপত্য ও বিশেষত্ব
রেড স্কয়ারের আয়তাকার সীমানাজুড়ে রাশিয়ার স্থাপত্যকলার বেশ কিছু বিশ্ববিখ্যাত ভবন বিদ্যমান: ১. সেন্ট বাসিলস ক্যাথেড্রাল (St. Basil’s Cathedral): নয়টি প্রধান চ্যাপেল ও রঙিন পেঁয়াজ আকৃতির গম্বুজ সমন্বিত এটি রুশ অর্থোডক্স স্থাপত্যের অনুপম সৃষ্টি। ২. মস্কো ক্রেমলিন ও দেয়াল (Moscow Kremlin Wall & Towers): স্কয়ারের পশ্চিম সীমানায় অবস্থিত সুরক্ষিত প্রাচীর। বিখ্যাত স্পাসকায়া টাওয়ারের বিরাট লাল ঘড়ি এবং টাওয়ারের চূড়ায় বসানো চুনির কাচের লাল তারা এর প্রধান আকর্ষণ। ৩. স্টেট হিস্টোরিক্যাল মিউজিয়াম (State Historical Museum): উত্তরের গাঢ় লাল ইটের তৈরি নেও-রুশ স্থাপত্যের সুবিশাল ভবন, যেখানে ৪.৫ মিলিয়নেরও বেশি ঐতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষিত রয়েছে। ৪. গুম (GUM Department Store): স্কয়ারের পূর্ব পাশে অবস্থিত ভিক্টোরিয়ান ও সিউডো-রুশ স্থাপত্যের সুবিশাল ডিপার্টমেন্টাল স্টোর। এর কাচের ছাদটি প্রখ্যাত প্রকৌশলী অটো ক্রেল ও ভ্লাদিমির শুখভের উদ্ভাবিত তির্যক টাই-রড প্রযুক্তিতে নির্মিত, যা ছাদকে অত্যন্ত হালকা ও মজবুত কাঠামো দান করে। ৫. লেনিনের সমাধি ও ক্রেমলিন দেয়াল নেক্রোপলিস: গ্রানাইট ও ল্যাব্রাডোরাইট পাথরে তৈরি স্টেপ-পিরামিড আকৃতির সমাধিসৌধ এবং তার পেছনে অবস্থিত ক্রেমলিন দেয়াল নেক্রোপলিস, যেখানে মহাকাশচারী ইউরি গ্যাগারিন ও গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের অন্তিম শয়নস্থল রয়েছে। ৬. কাজান ক্যাথেড্রাল ও রেজারেকশন গেট: লাল-সাদা রঙের ঐতিহ্যবাহী ক্যাথেড্রাল ও দ্বৈত খিলানযুক্ত প্রবেশদ্বার।

৬) যেভাবে জায়গাটিতে যাওয়া যায়, ভ্রমণ সময় ও ভ্রমণ খরচ
- যাতায়াত ব্যবস্থা: রেড স্কয়ার একটি সম্পূর্ণ পথচারী অঞ্চল (Pedestrian Zone), তাই এখানে সাধারণ যানবাহন প্রবেশ নিষিদ্ধ। মস্কো মেট্রোর (Moscow Metro) মাধ্যমে অত্যন্ত সহজে এখানে পৌঁছানো যায়। নিকটবর্তী স্টেশনগুলো হলো প্লোশচাদ রেভলিউতসি (Ploshchad Revolyutsii), ওখতনি রিয়াদ (Okhotny Ryad), ও থিয়েত্রালনায়া (Teatralnaya), যেখান থেকে হেঁটে যেতে মাত্র ৪ মিনিট সময় লাগে।
- ভ্রমণ সময়: পুরো রেড স্কয়ার ও এর চারপাশের প্রধান স্থানগুলো ঘুরে দেখতে সাধারণত ২ থেকে ৩ ঘণ্টা সময় লাগে।
- ভ্রমণ খরচ ও টিকেট: রেড স্কয়ারের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে প্রবেশ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করা যায়। তবে শীতকালে গুম স্কেটিং রিঙ্কে স্কেটিং করার ফি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য প্রায় ৬০০ রুবেল এবং শিশুদের জন্য ২৫০ রুবেল (নিজের স্কেট থাকলে)। খাবারে সাশ্রয়ী হতে গুমের ৩য় তলার ঐতিহাসিক ‘স্তোলোভায়া ৫৭’ (Stolovaya 57) ক্যাফেটেরিয়া বা বুফে থেকে বাজেট ফ্রেন্ডলি মূল্যে ঐতিহ্যবাহী খাবার গ্রহণ করা যায়।

৭) ভ্রমণের জন্য যেখানে থাকবেন
রেড স্কয়ারের চমৎকার ভিউ পেতে ও কাছাকাছি অবস্থান করতে পর্যটকরা বেশ কিছু ক্যাটাগরির হোটেলে অবস্থান করতে পারেন:
- প্রিমিয়াম/লুক্সারিয়াস হোটেল: রেড স্কয়ার, স্টেট হিস্টোরিক্যাল মিউজিয়াম ও সেন্ট বাসিলস ক্যাথেড্রালের ওপর থেকে প্যানোরামিক ভিউ দেখার জন্য রিটজ-কার্লটন হোটেল (The Ritz-Carlton) অত্যন্ত বিখ্যাত। এছাড়া ঐতিহাসিক ন্যাশনাল হোটেল (National Hotel) স্কয়ারের লাগোয়া এলাকায় অবস্থিত।
- অন্যান্য এলাকা: মস্কোর সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্ট, গার্ডেন রিং (Garden Ring) বা বুলেভার্ড রিং এলাকায় অসংখ্য বাজেট হোটেল ও হোস্টেল রয়েছে, যেখান থেকে রেড স্কয়ার বা নিকটবর্তী মেট্রো স্টেশনে সহজে যাতায়াত করা সম্ভব।

৮) বর্তমান অবস্থা
বর্তমান সময়ে রেড স্কয়ার কেবল একটি ঐতিহাসিক স্মারক নয়, বরং রাশিয়ার সাংস্কৃতিক ও সামাজিক জীবনের প্রাণকেন্দ্র। প্রতিবছর ৯ই মে বিজয় দিবস উপলক্ষে এখানে রাষ্ট্রীয় সামরিক কুচকাওয়াজ (Victory Day Parade) অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া কনসার্ট, সংস্কৃতি উৎসব ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নিয়মিত আয়োজিত হয়। শীতকালে ক্রিসমাস ও নতুন বছর উপলক্ষে স্কয়ারটিকে চমৎকার আলোকসজ্জায় সাজানো হয়; গুমের সামনে বিশাল ক্রিসমাস মার্কেট ও বরফের স্কেটিং রিঙ্ক বসানো হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে বিশেষ অনুষ্ঠান ও মেলায় প্রবেশপথে মেটাল ডিটেক্টর ও নিরাপত্তা তল্লাশি থাকে। ভিড় এড়িয়ে শান্তিতে ঘুরে দেখতে ও ফটোগ্রাফি করতে সপ্তাহের কাজের দিনগুলোতে সকালে আসা সবচেয়ে সুবিধাজনক।


Leave a comment