শহরের পিচঢালা রাস্তাগুলোর নিজস্ব কোনো রক্তমাংস নেই, কিন্তু রক্ত শুষে নেওয়ার এক অদ্ভুত তৃষ্ণা আছে।
আমার নাম শামসুল হক। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। পেশায় পুলিশ কনস্টেবল। গত বারো বছর ধরে আমি এই খাতিরের ইউনিফর্মটা গায়ে চাপিয়ে আসছি। মানুষের ধারণা, পুলিশের চামড়া নাকি গণ্ডারের মতো মোটা হয়ে যায়। প্রতিদিন কত শত অপরাধ, মারামারি আর দুর্ঘটনাকবলিত লাশ দেখে দেখে আমাদের চোখ নাকি পাথরের মতো শুকিয়ে যায়। তারা ভুল ভাবে না। ইউনিফর্ম পরলে বুকেরভেতরের মানুষটাকে কোথাও শক্ত কোনো লোহার সিন্দুকে বন্ধ করে রাখতে হয়, নয়তো ডিউটি করা যায় না।
সেদিন সকাল আটটায় যখন বাড়ি থেকে বের হই, তখনো শহরের রোদ চড়া হয়নি। আমার আট বছরের ছেলে তুহিন আমার নীল রঙের ইউনিফর্মের হাতাটা চেপে ধরেছিল।

“আব্বু, আজকে তো শুক্রবার না, তাও তুমি এতো সকালে যাচ্ছ? আজকে একটু তাড়াতাড়ি আসবা? বিকেলে আমাকে ওই মেলায় নিয়ে যাবা না?”
আমি তুহিনের মাথায় হাত রেখেছিলাম। ওর স্কুলের নীল শার্টটার বোতাম তখনও খোলা ছিল। একটু হেসে বলেছিলাম, “ডিউটি শেষ করে আসব, বাবা। তুই ব্যাগ গুছিয়ে রাখ।”
আমি জানতাম না, এটাই ছিল আমার ছেলের সাথে আমার শেষ বাক্য বিনিময়। দুপুর দুটো বাজতেই ওয়্যারলেসে একটা মেটালিক, কর্কশ শব্দ ভেসে এলো—‘অল কন্ট্রোল, এক্সিডেন্ট এট মেইন রোড… মেম্বারস টু স্পট সাডেনলি… ওয়ান চাইল্ড ক্যাজুয়াল্টি… ওভার।’
আমি গাড়ির স্টিয়ারিং ঘোরালাম। একজন পুলিশের কাছে লাশ কেবলই একটি ‘কেস ফাইল’ এবং রক্তভেজা সড়ক কেবলই একটি ‘ঘটনাস্থল’। অন্তত সেই মুহূর্ত পর্যন্ত আমি তেমনই ভাবছিলাম।

ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর বাতাসের গন্ধটা চেনা গেল—পোড়া মবিল, সস্তা পেট্রোল আর কাঁচা রক্তের মিশেল। একটা দশ চাকার বেপরোয়া ট্রাক ততক্ষণে সটকে পড়েছে, রাস্তায় ফেলে গেছে কেবল বিভীষিকা।
মানুষের বড় ভিড়। সবাই ফোফো করে নিঃশ্বাস ফেলছে, কেউ ভিডিও করছে ফোনে, কেউ গালি দিচ্ছে অদৃশ্য চালককে। আমি ভিড় ঠেলে সামনে এগোলাম। পুলিশের রুটিন কাজ শুরু করার কথা—ফটোগ্রাফি, স্ট্রেচার ডাকা, ট্রাফিক ক্লিয়ার করা।

জনতার ভিড় থেকে কেউ একজন বলে উঠল, “আহা রে! প্রাইমারির বাচ্চাটা… নাম নাকি তুহিন…”
কথাটা শোনামাত্রই আমার বুকের ভেতর কিছু একটা ভেঙে গুঁড়িয়ে গেল। মাথার ওপর চড়া রোদটা যেন মুহূর্তের মধ্যে কুচকুচে কালো হয়ে এলো। পা দুটো মনে হচ্ছিল শত মণ ভারী হয়ে মাটিতে আটকে গেছে।
না, এটা অন্য কেউ। পুরো শহরে শত শত তুহিন আছে।
আমি এক পা এগোলাম। ধুলো আর রক্তের ওপর ছড়িয়ে থাকা ছোট নীল শার্টটা দেখতে পেলাম। শার্টের কলারের ভেতরের দিকে আমার স্ত্রীর হাতে সেলাই করা ছোট নাম লেখা দাগটি স্পষ্ট—তুহিন।
ছেলেটার মুখটা একপাশে কাত হয়ে পড়ে ছিল। সাদা জুতোজোড়ার একটা ছিটকে গিয়ে পড়ে আছে ড্রেনের পাশে।

আমি আমার ইউনিফর্ম পড়া হাত দুটো বাড়িয়ে দিলাম। কিন্তু আঙুলগুলো কাঁপছিল। যে হাতে আমি অপরাধীর হাতে কড়া পরাই, যে হাতে রাইফেল ধরে দেশের দায়িত্ব পালন করি—সেদিন নিজের সন্তানকে তোলার ক্ষমতা সেই হাতের ছিল না। আমি কনস্টেবল শামসুল হক, সেদিন রাস্তার ওপর হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছিলাম।
আমি একটা নিথর পৃথিবীকে নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলাম।
আমরা সংবাদের পাতায় প্রতিদিন ছোট ছোট অক্ষরে কিছু খবরের শিরোনাম দেখি: ‘ট্রাকের চাপায় পিষ্ট শিশু’, ‘চালক পলাতক’, ‘আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন’।
১৮ বছর বয়সের নিচের মানুষ হয়তো এগুলোকে সাধারণ কিছু সংখ্যা বা তথ্য হিসেবে দেখে পার পেয়ে যায়। কিন্তু একজন বয়স্ক মানুষ, একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে এই বাক্যগুলোর পেছনের অন্ধকারটা দেখা জরুরি।
একটা ভাঙা রাস্তা শুধু সরকারের ইট-পাথরের খামখেয়ালি নয়, ওটা একটা ঝুলন্ত ফাঁদ।
একটা ভুয়া লাইসেন্সধারী অদক্ষ চালক মানে কেবল আইন অমান্যকারী নয়, সে রাস্তায় নেমে আসা একজন বৈধ আততায়ী।
আর ওভারটেক করার সেই দু-সেকেন্ডের প্রতিযোগিতা আসলে একটা আস্ত পরিবারকে জীবন্ত কবর দেওয়ার কসাইখানা।
ময়নাতদন্তের টেবিলে যখন আমার ছেলের ছোট্ট শরীরটা শায়িত ছিল, আমি বাইরে দাঁড়িয়েছিলাম। একজন পুলিশ হিসেবে শত শত পোস্টমর্টেম রিপোর্টের কাগজ আমি সাইন করেছি। কিন্তু সেদিন আমার মনে হচ্ছিল, এই ময়নাতদন্তটা আমার ছেলের নয়—বরং আমাদের পচে যাওয়া সড়ক ব্যবস্থা এবং আমাদের চরম নাগরিক বেপরোওয়াপনার।
আমরা ট্রাফিক আইন মানি কেবল ফাইন বা পুলিশকে ভয় পেয়ে। মানুষকে ভালোবেসে, অন্যের জীবনের মূল্য দিয়ে আমরা গাড়ি চালাই না। আর তার মূল্য মেটাতে হয় এমন সব তুহিনদের, যাদের স্বপ্নের পরিধি ছিল কেবল একটা নতুন স্কুলব্যাগ আর বাপের সাথে বিকেলে মেলায় যাওয়া।
বাড়ি ফেরার পর পৃথিবীটা থামে না, কিন্তু ঘরটা চিরকালের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়।
তুহিনের ঘরের টেবিলটায় এখনো তার ছবি আঁকার খাতাটা খোলা। শেষ ছবিতে সে একটা সবুজ রঙের লাল-সবুজ গাড়ি এঁকেছিল। চাকাগুলো গোল হয়নি, কিছুটা বাঁকা। বিছানার পাশে ওর ছোট জুতোর জোড়া দুটি রাখা।

আমার স্ত্রী কান্নাও ভুলে গেছে। সে শুধু মাঝরাতে উঠে তুহিনের ব্যাগ থেকে খাতা বের করে ঘ্রাণ নেয়।
আমি পুলিশ। আমার কাজ অপরাধীকে ধরা। আমি হয়তো সেই ট্রাকচালককে কদিন পর গ্রেপ্তার করব, তাকে জেলে পাঠাব, চার্জশিট জমা দেব। কিন্তু আদালতের কোনো রায়, কোনো কাঠগড়া, কিংবা আইনের কোনো অনুচ্ছেদ আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দিতে পারবে না।
আমি আইনের লোক হয়েও সময়কে মাত্র এক সেকেন্ডের জন্য পেছনে পাঠাতে পারি না।
কাজে ফিরেছি আবার। আজ রাতেও নাইট ডিউটি আছে। নীল ইউনিফর্মটা আবার গায়ে চাপাতে হয়েছে। আয়নায় নিজেকে দেখে এখন নিজেরই ভয় করে। মনে হয়, এই ইউনিফর্মের ভেতরে যে লোকটা দাঁড়িয়ে আছে, সে আসলে জীবন্ত এক প্রেতাত্মা।
আজ রাতে যখন আমি রাস্তার মোড়ে সিগন্যাল লাইটের নিচে দাঁড়াব, তখন প্রতিটা বেপরোয়া গতিতে আসা গাড়ির হেডলাইটে আমি তুহিনের শেষ মুখটা দেখতে পাব।
আমি কোনো অনুযোগ করছি না। কোনো সহানুভূতি ভিক্ষা করছি না।
আমি শুধু আপনাদের—এই দেশের সচেতন, প্রাপ্তবয়স্ক মানুষদের কাছে একটা মিনতি করছি: আমাদের সড়কগুলোকে মৃত্যুর ফাঁদ বানাবেন না। স্ট্রিট রেস, বেপরোয়া ওভারটেকিং আর একটুখানি সময়ের তাড়াহুড়ো কেড়েনেয় কোনো এক বাপের পৃথিবী।
আজ যে শিশুটি পিচের ওপর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল, সে হয়তো আগামী দিনের কোনো বড় ডাক্তার হতো, শিক্ষক হতো, কিংবা এই ভাঙা সমাজটাকে বদলে দেওয়া কোনো মহান নেতা হতো। আমরা এক সেকেন্ডের বেপরোয়া চাকা ঘুরিয়ে একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎকে পিষে মেরে ফেললাম।
ডিউটিতে যাওয়ার আগে আমি তুহিনের ছবির দিকে তাকাই।

“তুহিন, বাবা… ক্ষমা করে দিস। সেদিন আমি দেশের একজন ‘কর্তব্যপরায়ণ’ পুলিশ হতে পেরেছিলাম, কিন্তু তোকে বাঁচানোর মতো একজন ‘বাবা’ হতে পারি নাই।”

Leave a comment