
এই শহরটা দিনের বেলায় খুব চকচকে, কিন্তু রাতের অন্ধকারে এর রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে থাকে এক আদিম বীভৎসতা। অনির্বাণ জানলার পাশে দাঁড়িয়ে দেখছিল নিওন আলোর নিচে ঢাকা পড়া সেই অন্ধকার। বড় বড় অট্টালিকার তলায় পিষ্ট হওয়া কোনো এক শিশুর আর্তনাদ কি এই শহরের বিলাসবহুল এসি গাড়ির কাঁচ ভেদ করে কারো কানে পৌঁছায়? নাকি আমরা সবাই এক জঘন্য নীরবতার চুক্তিতে আবদ্ধ।
শ্রাবন্তী ছিল এক ফালি রোদের মতো, যার শৈশব চুরি হয়ে গেল এক ক্ষমতাশালী হায়েনার থাবায়। গলির মোড়ে সেই পরিত্যক্ত দালানের আড়ালে যখন তার আর্তনাদ গুমরে মরছিল, তখন ক্ষমতার দাপটে অন্ধ এক পুরুষ তার মুখ চেপে ধরেছিল। সেই হাতটা ছিল দামী ঘড়ি আর আভিজাত্যে মোড়া, কিন্তু ভেতরে ছিল পশুর চেয়েও অধম এক প্রবৃত্তি।


বিচারালয়ের বারান্দায় অনির্বাণ যখন সেই ক্ষমতাশালী লোকটির মুখোমুখি হলো, দেখল তার চোখে কোনো অনুশোচনা নেই, আছে শুধু ক্ষমতার দম্ভ। লোকটি হাসছিল, যেন আইন আর আদালত তার পকেটে থাকা কিছু খুচরো পয়সা মাত্র। অনির্বাণ বুঝতে পারল, এই সমাজে বিচার মানে কেবল দুর্বলকে আরও বেশি লাঞ্ছিত করা আর সবলকে মুক্তির সনদ দেওয়া।
অনির্বাণ তার বন্ধু দীপ্তকে জিজ্ঞেস করল, “আমরা কি মানুষ নাকি চামড়া দিয়ে মোড়া কিছু যন্ত্র? আমাদের চোখের সামনে একটা ফুলের মতো জীবন শেষ হয়ে গেল, আর আমরা সবাই নিরাপদ দূরত্বের দোহাই দিয়ে চুপ করে আছি?” দীপ্ত কফির কাপে চুমুক দিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিল। এই মধ্যবিত্ত আরামের জীবনে ঝামেলার কোনো জায়গা নেই, প্রতিবাদ এখানে এক বিলাসিতা মাত্র।
শ্রাবন্তীর মায়ের কান্নায় আকাশ বাতাস ভারী হয়ে ওঠে, কিন্তু সংবাদপত্রের পাতায় তার স্থান হয় ছোট এক কোণায়। অনির্বাণ কল্পনায় দেখল শ্রাবন্তীকে—সে যেন শ্বেতশুভ্র পোশাকে এক হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আর তার শরীর থেকে ঝরছে বিচারহীনতার রক্ত। এই রাষ্ট্রের বিবেক কি এতটাই অসাড় যে, এই রক্ত তাকে আর বিচলিত করে না?


বাজারে ভিড়, শপিং মলে হাসি-তামাশা, সব চলছে আপন গতিতে। দীপ্ত যখন ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে নিজের স্মার্টফোনে আঙুল ঘষছিল, তখন পাশ দিয়ে এক অচেনা লোক তাকে ধাক্কা দিয়ে চলে গেল। কেউ কারো দিকে তাকানোর সময় নেই। এই বিচ্ছিন্নতা, এই স্বার্থপরতা আসলে এক সামাজিক ক্যানসার, যা আমাদের ভেতরটা কুরে কুরে খাচ্ছে।
অনির্বাণের কলম এখন তরবারি হয়ে উঠেছে। সে লিখল সেই সব মুখোশধারী মানুষের কথা, যারা দিনে সমাজসেবক আর রাতে নেকড়ে। সে লিখল সেই নীরব দর্শকদের কথা, যারা ধর্ষণের চেয়ে প্রতিবাদের শব্দকে বেশি ভয় পায়। তার ঘর এখন ছেঁড়া কাগজে ভর্তি, প্রতিটি শব্দ যেন এক একটি বিদ্রোহের আগুন হয়ে জ্বলছে।
একদিন রাস্তায় অনির্বাণের সাথে দীপ্তর আবার দেখা হলো। অনির্বাণ দীপ্তর হাত ধরে ঝাঁকিয়ে বলল, “আর কতকাল মুখ লুকিয়ে থাকবি? আজ শ্রাবন্তী, কাল হয়তো তোর বা আমার কেউ। এই আগ্নেয়গিরি যখন ফাটবে, তখন কেউ রক্ষা পাবে না।” দীপ্তর চোখে প্রথমবার এক ধরণের অপরাধবোধ এবং জাগরণ দেখা দিল। সে আর চোখ সরিয়ে নিতে পারল না।


অন্ধকার গলি থেকে বেরিয়ে আসা সেই সব নির্যাতিত শিশুদের আত্মা যেন আজ এই শহরের অলিগলিতে মিছিল করছে। শ্রাবন্তীর ফেলে যাওয়া একটি জরাজীর্ণ পুতুল রাস্তায় পড়ে ছিল, যা ক্ষমতার দম্ভে পিষ্ট হয়ে মাটির সাথে মিশে গেছে। সেই মৃত পুতুলটা যেন একটা জাতির নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
শেষ পর্যন্ত মশালটা জ্বলল। অনির্বাণ আর দীপ্ত যখন শহরের চত্বরে হাজারো মানুষের ভিড়ে সামিল হলো, তখন তাদের গলায় ছিল বিদ্রোহের গান। এই গল্প শেষ হওয়ার নয়, বরং শুরু। যেখানে শৃঙ্খল ভাঙার শব্দ শোনা যায়, যেখানে ক্ষমতার দম্ভ ধুলোয় মিশে যায়, সেখানেই এক নতুন ভোরের জন্ম হয়। প্রতিবাদই এখন বেঁচে থাকার একমাত্র উপায়।


Leave a comment