বাংলাদেশের মাগুরা জেলার একটি ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের নাম শ্রীপুর জমিদার বাড়ি । এটি কেবল একটি প্রাচীন অট্টালিকাই নয়, বরং এর সাথে মিশে আছে বাংলার বারো ভূঁইয়ার বীরত্ব গাঁথা এবং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী উপন্যাসের প্রেক্ষাপট ।
শ্রীপুর জমিদার বাড়ির পরিচিতি

মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলা সদর থেকে মাত্র ১ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই শ্রীপুর জমিদার বাড়ি । বর্তমানে এটি একটি ধ্বংসাবশেষ হলেও এর কারুকাজ এবং বিশালাকার কাঠামো পর্যটকদের মুগ্ধ করে । এই জমিদার বাড়িটিকে ঘিরেই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার বিখ্যাত ‘বৌঠাকুরানীর হাট’ উপন্যাসটি রচনা করেছিলেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে ।
ইতিহাস ও ঐতিহ্য
শ্রীপুর জমিদার বাড়ির ইতিহাস বেশ প্রাচীন। জানা যায়, ১৫০০ শতাব্দী পর্যন্ত এই অঞ্চলের জমিদারী ছিল নবাব আলীবর্দী খাঁর অধীনে । পরবর্তীতে জমিদার সারদা রঞ্জন পাল চৌধুরী নবাবের কাছ থেকে এই জমিদারি কিনে নেন ।
এই বাড়ির ইতিহাসের সাথে যশোরের প্রভাবশালী রাজা প্রতাপাদিত্যের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে । জমিদার সারদা রঞ্জন পাল চৌধুরীর মেয়ে বিভা রানী পাল চৌধুরীর সাথে রাজা প্রতাপাদিত্যের ছেলে উদয়াদিত্যের বিবাহ হয়েছিল । কথিত আছে, রাজা প্রতাপাদিত্য নিজে শ্রীপুরে এসেছিলেন এবং এই বিশাল জমিদার বাড়িটি নির্মাণে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছিলেন । প্রতাপাদিত্য ও সারদা রঞ্জনের মধ্যকার সম্পর্কের টানাপড়েন এবং বিভা রানীর জীবন কাহিনীকেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার উপন্যাসে ফুটিয়ে তুলেছিলেন।

সাইটের অবকাঠামো ও বর্তমান অবস্থা

শ্রীপুর জমিদার বাড়িটি মূলত ইট, সুরকি এবং লোহার রড দিয়ে নির্মিত একটি প্রাসাদতুল্য ভবন । বর্তমানে প্রাসাদটির অনেক অংশই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে । তবে এখনো এর সিংহদ্বার বা প্রবেশপথ এবং ভেতরের কিছু কক্ষ ভগ্ন অবস্থায় টিকে আছে, যা অতীতের জাঁকজমকপূর্ণ দিনগুলোর সাক্ষ্য দেয় । অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এখন পর্যন্ত এই ঐতিহাসিক বাড়িটি সংরক্ষণের কোনো সরকারি উদ্যোগ নেয়নি।
যেভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে সড়কপথে পদ্মা সেতু হয়ে খুব সহজেই মাগুরা জেলায় পৌঁছানো যায় ।
- বাস সেবা: সোহাগ, হানিফ, ঈগল বা দ্রুতি পরিবহনের এসি ও নন-এসি বাসে ঢাকা থেকে মাগুরা যাওয়া যায়। ভাড়া গন্তব্য ও বাস ভেদে ৫৪০ থেকে ১৩০০ টাকার মধ্যে।
- মাগুরা থেকে শ্রীপুর: মাগুরা জেলা সদর থেকে শ্রীপুর উপজেলার দূরত্ব প্রায় ১৫ কিলোমিটার । মাগুরা থেকে বাসে করে শ্রীপুর স্ট্যান্ডে নেমে রিকশা বা ইজিবাইকযোগে মাত্র ১ কিলোমিটার পথ পেরিয়েই জমিদার বাড়িতে পৌঁছানো যায়। এটি শ্রীপুর-সাচিলাপুর রাস্তার বাম পাশে অবস্থিত ।
ভ্রমণ সময় ও খরচ
ভ্রমণের জন্য দিনের বেলা সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। ঢাকা থেকে আসা-যাওয়া এবং স্থানীয় যাতায়াত খরচ মিলিয়ে জনপ্রতি ১৫০০ থেকে ২৫০০ টাকার মধ্যে খুব ভালোভাবে ঘুরে আসা সম্ভব। তবে সময়ের সাথে সাথে বাস ভাড়া ও অন্যান্য খরচ পরিবর্তিত হতে পারে, তাই ভ্রমণের আগে বর্তমান তথ্য যাচাই করে নেওয়া শ্রেয় ।
যেখানে থাকবেন
মাগুরা শহরে রাত্রিযাপনের জন্য মাঝারি মানের কিছু আবাসিক হোটেল রয়েছে। উল্লেখযোগ্য হোটেলের মধ্যে রয়েছে হোটেল চলন্তিকা এবং ছায়া বিথী । এছাড়া জেলা পরিষদের অনুমতি সাপেক্ষে জেলা পরিষদ ডাক বাংলো অথবা মাগুরা সার্কিট হাউজেও থাকা যেতে পারে ।
ঐতিহাসিক স্থানগুলো আমাদের জাতীয় সম্পদ। তাই ভ্রমণের সময় পরিবেশের ক্ষতি হয় এমন কোনো কাজ করা থেকে বিরত থাকুন এবং প্রাচীন স্থাপনাগুলোর প্রতি যত্নবান হোন।

Leave a comment