সেদিন রাতটা ছিল খুব দীর্ঘ…
ঘড়ির কাঁটা চলছিল,
কিন্তু আমাদের সময় যেন থেমে ছিল নদীর ওপারে…
বাবা শুধু বলেছিলেন—
“বাবা… বুকে খুব ব্যথা করছে…”
আমি বলেছিলাম—
“ভয় পেয়ো না আব্বা, হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি…”
কিন্তু হাসপাতালের পথের আগে
আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল—
অপেক্ষা।
নদী।
আর একটি না থাকা সেতু।
রাত সাড়ে দশটা, নিঝুম শহর, কাঁপছে আমার হাত,
বুক চেপে বাবা বললেন শুধু—“বাবা, ভীষণ ব্যথা আজ
ছুটে গেলাম হাসপাতালের সেই সাদা করিডোরে,
ডাক্তার বললেন—“সময় নেই, নিতে হবে শহরের ওপারে।
বললাম আমি—“বরিশাল তো খুব বেশি দূর নয়!”
ডাক্তার চুপ, আর বাবার চোখে জমে উঠল ভয়।
মানচিত্রে দূরত্ব কম ছিল, বাস্তবে কত পথ—
মাঝখানে নদী দাঁড়িয়ে যেন লিখছে মৃত্যুর শপথ।

একদিকে সাইরেন বাজে, একদিকে সময় ফুরায়,
একটি জীবন বাঁচাতে গিয়ে অপেক্ষা শুধু বাড়ায়।
আমি বাবার হাতটা ধরে বলি—“আর একটু থাকো…”
কিন্তু সময় নদীর মতোই বয়ে যায়, থামে না কোনো দুঃখে।
যদি একটি সেতু থাকত—
হয়তো বাবা আজও থাকত!
সাইরেন বাজিয়ে ছুটতাম আমরা,
সময়টাকে হার মানাতাম তখন!
আর কত প্রাণ যাবে বলো,
আর কত চোখে কান্না?
ভোলা আর কত অপেক্ষা করবে—
কবে হবে দুই পাড়ের বন্ধন?

ভোলা–বরিশাল সেতু চাই!
জীবন বাঁচাতে সেতু চাই!
আর কোনো “যদি” নয়—
আজই আমাদের সেতু চাই!
আমি একা নই, এই গল্প শুধু আমার নয়,
কত মায়ের প্রসব ব্যথা নদীর বুকে হারায় ভয়।
কত শিশুর জ্বরের রাতে কাঁপে বাবার বুক,
স্ট্রোকের রোগী ভাবে আগে—“কোন পথে পাবো সুখ?”
কেউ চিকিৎসা খোঁজে পরে, আগে খোঁজে নদীর ঘাট,
একটা জীবন ঝুলে থাকে সময়সূচির সাথে রাত।
ফেরি যদি না আসে তবে? লঞ্চ যদি চলে যায়?
একটি মানুষের শেষ নিঃশ্বাস কি অপেক্ষা করতেই চায়?

আমরা কি এই দেশের মানুষ নই?
আমাদের কি সময়ের দাম নেই?
একটি জেলায় অসুখ হলে
আগে নদী পার হওয়ার চিন্তা কেন?
যদি একটি সেতু থাকত—
হয়তো বাবা আজও থাকত!
হাসপাতালের পথে ছুটতাম আমরা,
মৃত্যুকে হয়তো হার মানাতাম!
আর কত আমজাদ, কত বাবা,
কত স্বপ্ন যাবে ঝরে?
একটা সেতুর অভাবে কেন
জীবন থেমে যাবে নদীর ওপারে?

ভোলা–বরিশাল সেতু চাই!
এটা কোনো বিলাসিতা নয়!
এটা মানুষের অধিকার—
এটা জীবন বাঁচানোর লড়াই!

Leave a comment