সেদিন রাতটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ রাত।
রাত প্রায় সাড়ে দশটা। বাবা হঠাৎ বুক চেপে ধরে বসে পড়লেন। তাঁর মুখটা মুহূর্তের মধ্যে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে শুধু বললেন—
“বাবা… বুকে খুব ব্যথা করছে…”
আমি বুঝতে পারছিলাম না কী করব।
মা চিৎকার করে উঠলেন। ছোট ভাই পানি আনতে দৌড় দিল। আমি বাবাকে ধরে বললাম,
— “আব্বা, ভয় পেয়ো না। আমরা এখনই হাসপাতালে যাচ্ছি।”

ভোলার স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হলো। ডাক্তার বাবাকে দেখে দ্রুত কয়েকটি পরীক্ষা করলেন। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন—
“এটা গুরুতর হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। এখানে সময় নষ্ট করা যাবে না। যত দ্রুত সম্ভব উন্নত কার্ডিয়াক চিকিৎসার জন্য বরিশাল অথবা ঢাকায় নিতে হবে।”
আমি যেন কথাটা শুনেও শুনিনি।
আমার চোখ শুধু বাবার দিকে।

তিনি তখন হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছেন। আর আমি ভাবছি—
বরিশাল তো খুব দূরে নয়!
মানচিত্রে দূরে নয়।
কিন্তু আমাদের জন্য?
একটি নদী।
একটি ফেরি।
একটি লঞ্চ।
অপেক্ষা।
আর অনিশ্চয়তা।
আমি অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করলাম। কিন্তু সামনে সেই পুরোনো প্রশ্ন—
“কীভাবে যাব?”
যদি একটি সেতু থাকত!

যদি ভোলা থেকে সরাসরি বরিশালে সড়কপথে যাওয়া যেত!
তাহলে হয়তো অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন বাজিয়ে আমরা ছুটে যেতে পারতাম। মিনিটের হিসাব করতে পারতাম। বাবার চিকিৎসার জন্য সময়ের সঙ্গে যুদ্ধ করতে পারতাম।
কিন্তু আমরা যুদ্ধ করছিলাম অন্য কিছুর সঙ্গে।
নদীর সঙ্গে নয়—অপেক্ষার সঙ্গে।
একটি সংযোগহীনতার সঙ্গে।
একটি সেতুর অভাবের সঙ্গে।
আমি বাবার হাত ধরে বসে ছিলাম।
বলছিলাম—
“আব্বা, আর একটু সময়… আমরা নিয়ে যাচ্ছি… তুমি কিছু হবে না…”

কিন্তু সময় কারও জন্য অপেক্ষা করে না।
হার্ট অ্যাটাকও না।
রাত যত গভীর হচ্ছিল, আমার বুকের ভেতর তত বড় হচ্ছিল আতঙ্ক।
আমি শুধু ভাবছিলাম—
আমার বাবা যদি ঢাকার কোনো হাসপাতালে থাকতেন?
বরিশালের কাছাকাছি কোনো জেলায় থাকতেন?
একটি সেতুর ওপারে থাকতেন?
হয়তো আজও তিনি আমার পাশে বসে থাকতেন।

হয়তো সকালে আমাকে ফোন করে বলতেন—
“অফিসে গেছিস?”
হয়তো নাতিদের সঙ্গে হাসতেন।
কিন্তু আমি আমার বাবাকে বাঁচাতে পারিনি।
আমি ডাক্তার নই।
আমি চিকিৎসার অভাবের জন্য বাবাকে হারাইনি।
আমি হারিয়েছি সময়ের কাছে।
আর সেই সময়ের সবচেয়ে বড় বাধা ছিল—
ভোলার মানুষের যোগাযোগ-বিচ্ছিন্নতা।
আজ আমি শুধু আমার বাবার জন্য কথা বলছি না।
আমি কথা বলছি সেই মায়ের জন্য, যিনি প্রসবকালীন জটিলতায় দ্রুত উন্নত হাসপাতালে পৌঁছাতে পারেন না।

আমি কথা বলছি সেই শিশুর জন্য, যার জরুরি চিকিৎসার সময় নদী পার হওয়ার ব্যবস্থা খুঁজতে হয়।
আমি কথা বলছি সেই রোগীর জন্য, যার স্ট্রোক হয়েছে, কিন্তু তাকে প্রথমে ভাবতে হয়—
“কীভাবে বরিশাল যাব?”
আমি কথা বলছি ভোলার প্রায় ২২ লক্ষ মানুষের জন্য।
আমরা কি বাংলাদেশের মানুষ নই?
আমাদের কি সময়ের মূল্য নেই?
আমাদের জীবন কি একটি ফেরির সময়সূচির ওপর নির্ভর করবে?

একটি জেলার মানুষ অসুস্থ হলে আগে কি ভাববে—
“ডাক্তার কোথায়?”
নাকি—
“নদী পার হব কীভাবে?”
আমরা উন্নয়ন চাই।
আমরা যোগাযোগ চাই।
আমরা আমাদের সন্তানদের জন্য নিরাপদ ভবিষ্যৎ চাই।
আর সেই কারণেই আমাদের দাবি স্পষ্ট—
ভোলা–বরিশাল সেতু চাই।
এখানে একটি বিষয় খুব পরিষ্কারভাবে বলতে চাই।

মেহেন্দীগঞ্জ হয়ে কোনো সংযোগ ভোলার মানুষের মূল সমস্যার প্রকৃত সমাধান নয়।
আমাদের প্রয়োজন এমন একটি যোগাযোগব্যবস্থা, যা ভোলাকে সরাসরি বরিশালের সঙ্গে যুক্ত করবে।
কারণ ভোলার মানুষের চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা, কর্মসংস্থান এবং দেশের দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগের বাস্তব প্রয়োজনের কেন্দ্রবিন্দু হলো—
সরাসরি ভোলা–বরিশাল সংযোগ।
শুধু মানচিত্রে একটি লাইন টানলেই মানুষের দুর্ভোগ শেষ হয় না।
একটি সেতুর পরিকল্পনা তখনই সফল, যখন সেটি মানুষের সময় বাঁচায়।
জীবন বাঁচায়।
অর্থনীতি বাঁচায়।
স্বপ্ন বাঁচায়।
আমার বাবাকে আর ফিরিয়ে আনা যাবে না।
কোনো সেতু তাঁকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিতে পারবে না।
কিন্তু আমি চাই না, আগামীকাল আরেকজন ছেলে হাসপাতালের করিডোরে দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলুক—
“আমি বাবাকে বাঁচাতে পারতাম… যদি একটু দ্রুত হাসপাতালে নিতে পারতাম।”
আমি চাই না, কোনো মা তার সন্তানকে হারিয়ে ভাবুক—
“যদি একটি সেতু থাকত…”
আমি চাই না, ভোলার মানুষের প্রতিটি জরুরি মুহূর্ত নদীর ওপারে আটকে থাকুক।
আজ আমার প্রতিবাদ কোনো রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে নয়।
আজ আমার প্রতিবাদ অবহেলার বিরুদ্ধে।
আজ আমার দাবি কোনো বিলাসিতা নয়।
এটি প্রয়োজন।
এটি অধিকার।
এটি সময়ের দাবি।
এটি জীবন বাঁচানোর দাবি।
ভোলার মানুষ আর বিচ্ছিন্ন থাকতে চায় না।

আমরা চাই—
সরাসরি ভোলা–বরিশাল সেতু।
কারণ একটি সেতু শুধু দুই প্রান্তকে যুক্ত করে না।
একটি সেতু যুক্ত করে—
হাসপাতালের সঙ্গে রোগীকে।
শিক্ষার সঙ্গে শিক্ষার্থীকে।
ব্যবসার সঙ্গে বাজারকে।
পরিবারের সঙ্গে ভবিষ্যৎকে।
আর কখনো কখনো—জীবনের সঙ্গে জীবনকে।
আমি আমার বাবাকে হারিয়েছি।
আর কোনো সন্তান যেন শুধু একটি সেতুর অভাবে তার বাবাকে না হারায়।
ভোলা–বরিশাল সেতু চাই।
আর কোনো অপেক্ষা নয়। আর কোনো বিচ্ছিন্নতা নয়। আর কোনো “যদি একটি সেতু থাকত…” নয়।

Leave a comment