বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি অত্যন্ত প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ জেলা হলো যশোর। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, শিক্ষা-সংস্কৃতি এবং অর্থনীতির বিচারে এই জেলাটি পুরো দেশেই এক অনন্য স্থান দখল করে আছে।
যশোর জেলার প্রতিষ্ঠা
স্থাপনের দিক থেকে যশোর বাংলাদেশের অন্যতম পুরাতন একটি জেলা। পাক-ভারত উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের শুরুতেই প্রশাসনিক সুবিধার জন্য ১৭৮১ সালে যশোর জেলায় ব্রিটিশ প্রশাসন প্রতিষ্ঠিত হয় । পরবর্তীতে ১৭৮৬ সালে যশোর কালেক্টরেট স্থাপিত হয় এবং এটি একটি স্বতন্ত্র জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ।
নামকরণের বিচিত্র ইতিহাস
“যশোর” শব্দটির উৎপত্তি নিয়ে নানা মতভেদ রয়েছে। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, সংস্কৃত শব্দ ‘যশোহর’ থেকে এই নামের উৎপত্তি, যার অর্থ ‘যশ হরণকারী’ । ধারণা করা হয়, রাজা বিক্রমাদিত্য কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এই রাজ্যের জৌলুস বাংলার তৎকালীন রাজধানী গৌড়ের যশ হরণ করেছিল বলেই এমন নামকরণ। অন্যদিকে, প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ আলেকজান্ডার কানিংহামের মতে, আরবি শব্দ ‘জসর’ (যার অর্থ সেতু বা সাঁকো) থেকে যশোর নামের উৎপত্তি হয়েছে । প্রাচীনকালে এই অঞ্চলে অসংখ্য খাল-বিল ও নদী থাকার কারণে যাতায়াতের জন্য প্রচুর সাঁকো ব্যবহার করা হতো বলেই এমন নাম হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক পরিচয়

যশোর জেলাটি মূলত একটি মৃতপ্রায় ব-দ্বীপের অংশ। বর্তমানে এই জেলার মোট আয়তন প্রায় ৬,৬৭৪ বর্গ কিলোমিটার । ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, এই জেলার মোট জনসংখ্যা প্রায় ৩০,৭৬,১৪৪ জন । লিঙ্গ অনুপাতে দেখা যায়, এখানে পুরুষের সংখ্যা ১৫,২৪,৩৪৯ জন এবং মহিলার সংখ্যা ১৫,৫১,৬৬৭ জন । প্রশাসনিক কাঠামোর দিকে তাকালে দেখা যায়, যশোর জেলায় মোট ৮টি উপজেলা, ৮টি পৌরসভা এবং ৯৩টি ইউনিয়ন রয়েছে ।
যশোরের গৌরবগাথা: যা অনেকেরই অজানা
১. প্রথম স্বাধীন জেলা: ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে যশোর এক অনন্য ইতিহাসের সাক্ষী। ১৯৭১ সালের ৮ ডিসেম্বর যশোর প্রথম জেলা হিসেবে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাত থেকে চূড়ান্তভাবে মুক্ত হয়। বাংলাদেশের প্রথম স্বাধীন পতাকা এই যশোর থেকেই উত্তোলন করা হয়েছিল ।

২. শিক্ষা ও গবেষণার অগ্রপথিক: উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন এবং প্রথম সারির শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ‘যশোর জেলা স্কুল’ অন্যতম, যা ১৮৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এছাড়া জ্যোতির্বিজ্ঞানী রাধাগোবিন্দ চন্দ তার আকাশ পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার জন্য হার্ভার্ড মানমন্দির থেকে সম্মাননা ও দূরবীন উপহার পেয়েছিলেন, যা এই মাটিরই গর্ব ।
বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব
যশোরের মাটি অসংখ্য বরেণ্য মনীষীর জন্ম দিয়েছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন:


- মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত: বাংলা সাহিত্যের সনেট ও অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক ।
- বাঘা যতীন: ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সাহসী বিপ্লবী ।
- মুন্সী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ: প্রখ্যাত ধর্ম প্রচারক ও সমাজ সংস্কারক ।
- শহীদ মশিউর রহমান: ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ।
জনপ্রিয় খাবার ও ঐতিহ্য
যশোরের ঐতিহ্যের কথা বললে সবার আগে আসে এর সুমিষ্ট খেজুরের রস ও গুড় । শীতকালে খেজুর গুড়ের পাটালির গন্ধে এখানকার বাতাস ম ম করে। এছাড়া এখানকার কই মাছ এবং ঐতিহ্যবাহী রসের পিঠা ও পায়েশ ভোজনরসিকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ।



শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং বীরত্বের এক অনন্য সংমিশ্রণ হলো যশোর। প্রাচীন ঐতিহ্যের সাথে আধুনিকতার মেলবন্ধন ঘটিয়ে এই জেলাটি আজও বাংলাদেশের মানচিত্রে স্বমহিমায় উজ্জ্বল ।
