দিনটি ছিল পহেলা মে ২০১৮। সেদিন অপ্রত্যাশিতভাবে অফিস থেকে চারদিনের সরকারি ছুটি পেয়েছিলাম। আর তাই ঐ চারদিন ময়মনসিংহ বিভাগে ভ্রমন করার একটি চমৎকার পরিকল্পনা করেছিলাম। কিন্তু ঐদিন আমার ময়মনসিংহ বিভাগে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকার পরেও বাসের স্বল্পতার কারণে আমি সেখানে যেতে পারিনি। ময়মনসিংহ ঘুরতে যাওয়ার জন্য আমি ভোর সাড়ে ছয়টায় ঘুম থেকে উঠি এবং সকাল আটটার দিকে মহাখালী বাস টার্মিনালে যাই। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পরে দেখি মানুষের অনেক ভিড়। এত লোক দেখে আমি কিছুটা অবাক হয়েছিলাম। আমি ভেবেছিলাম ছুটির দিন হওয়ায় মানুষের এতো ভিড় ছিলো। কিন্তু কিছু লোকের সাথে কথা বলার পরে আমি জানতে পারলাম যে, শ্রমিক দিবস হবার কারণে, দুপুর বারোটার আগে কোনও বাসের শিডিউল নেই। আর তাই, কিছুক্ষন অপেক্ষা করার পরে আমি আমার বাসায় ফিরে আসি । মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে আমার বাসায় ফিরতে খুব বেশি সময় লাগেনি। প্রায় ৫-১০ মিনিটের মধ্যে আমার বাসায় ফেরত গিয়েছিলাম। কারণ আমার বাসা মহাখালী বাস টার্মিনালের খুব কাছে ছিল।
Click on the link below to get this travel blog in English: https://iamnrdurjoy.wordpress.com/2020/12/16/nrds-tour-033-english/
আমি বিশ্রাম নিচ্ছিলাম এবং পরিকল্পনা করছিলাম; কীভাবে ময়মনসিংহে যাব, কোথায় থাকবো। গত কয়েকদিন ধরে বিশাল সিডিউল করার পর, প্রথমে আমার পরিকল্পনা করেছিলাম, ময়মনসিংহ বিভাগের নেত্রকোনা জেলায় যাবার। অনেক দেরি হওয়ায় আমি আমার পরিকল্পনাটি ময়মনসিংহ জেলায় যাবার জন্য পরিবর্তন করেছিলাম। আর তাই আমার বাসায় বসে ময়মনসিংহের আমি হোটেলগুলি অনুসন্ধান করছিলাম এবং সেগুলির ভাড়ার পরিমাণ দেখছিলাম।
হঠাৎ আমার ফোনে কল বেজে উঠল। ফোনের স্ক্রীনের দিকে তাকিয়ে দেখি; MMCA Zakir Hossain vai calling! আরে এতো দেখি জাকির ভাই, কতদিন দেখা হয়না। অনেকদিন পর জাকির ভাইয়ের ফোন পেয়ে খুব ভালই লাগলো। জাকির ভাই খুব সাদা মনের মানুষ এবং আমার খুব কাছের বড় ভাই। সিএ ফার্মে প্রায় সাড়ে তিন বছর ওনার সান্নিধ্যে থেকে কাজ করেছিলাম। জাকির হোসেন ভাই আমাকে ফোন করে জিজ্ঞাসা করলেন আমি এই চানদিনের লম্বা ছুটিতে কোথায় বেড়াতে যাচ্ছি। আমি তাকে পুরো ঘটনার বর্ণনা করলাম । আমার কথা শুনার পর জাকির ভাই আমাকে তার সাথে মাদারীপর যাবার প্রস্তাব দিয়েছিলেন যেখানে আরো দুজন সহকর্মীও ( আসিফ এবং হাফিজ) যাবে। প্রথমে আমি তাকে নাসূচব জবাব দিলেও হঠাৎ করেই আমার মন বদলে গেল মাদারীপুরে যাবার জন্য। কেননা অনেক সময় পরে আমি আমার প্রাক্তন সহকর্মীদের সাথে দেখা করার সুযোগ পাব যাদের সাথে আমার ভ্রমন করার, জীবন উপভোগ করার অনেক দারুণ সুন্দর স্মৃতি ছিল। তারপর আমরা দুজনেই অন্য দুজন সহকর্মীকে ফোন দিয়ে আমাদের সাথে যাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলাম। তবে কিছু অস্বাভাবিক পরিস্থিতির কারণে তারা আমাদের সাথে মাদারীপুর ভ্রমনে যেতে পারছিলো না।
আলহামদুলিল্লাহ ! ঠিক বারোটার দিকে আমার বাসা, নাখালপাড়া থেকে মাদারীপুরের দিকে যাত্রা শুরু করি ।অন্যদিকে ফার্মগেটে জাকির হোসেন ভাই আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। ফার্মগেটে জাকির ভাইকে সাথে নিয়ে আমরা একটি লোকাল বাস ভাড়া করে দুপুর সাড়ে বারোটায় ফুলবাড়িয়া, বংশাল-এ পৌছেছিলাম । ছুটির দিন হওয়ায় রাস্তাটি খুব ফ্রি ছিল আর আমরা খুব দ্রুত ফুলবাড়িয়া পৌছেছিলাম।


বংশালে পৌঁছে আমরা ইলিশ পরিবহনের দুটি আসন জনপ্রতি সত্তর টাকা হারে ভাড়া করেছিলাম। ওই বাসটির মাওয়া ঘাটে যাওয়ার সিডিওল ছিল। বাসটি বংশাল থেকে দুপুর বারোটা পয়তাল্লিশ মিনিটে রওয়ানা হয় এবং দুপুর দুইটা পনের মিনিটে গিয়ে মাওয়া ঘাটে গিয়ে পৌঁছায় । ঐ বাসটি দিয়ে বংশাল থেকে মাওয়া ঘাটে যেতে প্রায় দেড় ঘন্টা সময় লেগেছিলো যা স্বাভাবিকের থেকে খুবই কম সময়।

আপনাদের সুবিধার্থে বলে দেই, মাওয়া ঘাট থেকে কাঁঠালবাড়ী ঘাটে যেতে দুটি উপায় আছে। একটি উপায় অন্য লঞ্চ আরেকটি স্পিডবোট। আমরা কাঁঠালবাড়ী ঘাটে যেতে স্পিডবোট মাধ্যমটি বেছে নিই। মাওয়া ঘাটে পৌছার পরে স্পিড বোট বেছে নিতে একজন পর্যটককে বাম দিকে যেতে হয়। স্পিডবোটই কাঠালবাড়ী ঘাটে যাওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায়। প্রথমে একজন পর্যটককে স্পিড বোটের টিকিট কিনতে একশত পঞ্চাশ টাকা খরচ করতে হয়। এখানে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হচ্ছে; স্পিড বোটে যাওয়ার জন্য পর্যটকদের এত দীর্ঘ অপেক্ষা করার দরকার নেই। স্পিড বোটগুলি খুব সহসাই ঘাটে পাওয়া যায় এবং খুব কম সময়ে কাঁঠালবাড়ী ঘাটে পৌছানো যায়।
আমরা দুপুর ঠিক দুইটা পঁচিশ মিনিটে মাওয়া ঘাট থেকে রওয়ানা দিয়েছিলাম। নদীর পাশের প্রকৃতি আমার কাছে সর্বদা খুবই প্রিয়। ব্যতিক্রমী রোদময়ী নদীটি পেয়ে আমি সেদিন ভালোই উপভোগ করছিলাম। আমাদের সেদিন মাওয়া ঘাট থেকে কাঁঠালবাড়ী ঘাটে পৌঁছতে প্রায় বিশ মিনিট সময় লেগেছিলো। এত দ্রুত সেখানে পৌঁছে আমি খুব অবাক হয়েছি। কেননা আমার ব্যবহার করা বরিশাল-ভোলা রুটে স্পিডবোটে যাতায়াত করতে প্রায় পয়তাল্লিশ মিনিট সময় লাগে।
কাঁঠালবাড়ী ঘাটে পৌছে আমার খুব ক্ষুধা লেগেছিলো। তবে আমরা আমাদের মধ্যাহ্নের খাবার হিসাবে ডাব-নারকেল খেয়ে নেই। কাঁঠালবাড়ী ঘাটে পঞ্চাশ-ষাট টাকা হারে যেকেউ একটি নারকেল খেতে পারবেন।

কাঠালবাড়ী ঘাটে আমরা মাদারীপুরে পৌঁছনোর জন্য খুব কম বাস সার্ভিস থাকার কারণে মাদারীপরে যাবার গাড়ি বেছে নিতে খুব সমস্যা হচ্ছিলো। শেষবার ২০১৫ সালে যখন আমি কাঠালবাড়ী ঘাটে গিয়েছিলাম তখন সেখানে প্রচুর বাস পাওয়া যেত। এবার আমি ২০১৫ সালের তুলনায় খুব কম বাস পেয়েছি । এবার খুব কম বাস-ই ছিল যা আমাদের মাদারীপুরে নিয়ে যেতে পারে। আপনি যদি মাদারীপুর যেতে মাইক্রো বাস পছন্দ করেন তবে আপনাকে জনপ্রতি দুইশত টাকা খরচ করতে হবে। আপনি যদি বাসে যেতে চান তবে আপনাকে জনপ্রতি আশি টাকা খরচ করতে হবে। আপনি যদি মাহিন্দ্রা বা দ্রুতগতিতে অটো যেতে চান তবে আপনাকে একশত পঞ্চাশটাকা খরচ কতে হবে । গাড়ি ভাড়া নিতে আমাদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছিল। সময়টি ছিল একটি রৌদ্রোজ্জ্বল মধ্যাহ্ন যার কারণে যাত্রীসংখ্যা খুবই কম ছিল। ঠিক এই আমাদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছিল।

দীর্ঘ অপেক্ষার পরে বিকেল ৩ টা ৪৫ মিনিটে আমরা কাঠালবাড়ি ঘাট থেকে রওয়ানা দিয়েছিলাম। আমরা সন্ধ্যা ৫ টায় টেকেরহাট রাজৈর বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছেছিলাম। আসলে কাঠালবাড়ি ঘাট থেকে মাদারীপুর জেলার রাজৈর উপজেলার টেকেরহাট বাস স্ট্যান্ডে যেতে চল্লিশ মিনিটের বেশি সময় লাগে না। সম্ভবত গাড়ীটি কম জ্বালানি থাকায় সেদিন আমাদের পৌঁছতে এতটা সময় লেগেছিলো।

দুপুরের খাবারের পরে আমরা আমাদের গেস্ট হাউস, শান্তি কেন্দ্রে যাই। এই অতিথালয়ে আমি ২০১৪ সালে প্রায় ৪৯ দিন থেকেছিলাম। সেবারও আমার ভ্রমণসঙ্গী ছিল, জাকির ভাই। ২০১৪ সালের পরও আমি কয়েক বছর পরে কয়েকবার সেখানে গিয়েছিলাম এবং কিছু দিন থেকেছিলাম। আমি যখনি এই অতিথালয়ে যাই, তখন সর্বদাই এটি আমার মনে অন্যরকাম একটি সুখের অনুভূতি আনে। ঐদিন রাতে আমাদের খুব ভাল সময় কেটেছিল। গভীর রাত পর্যন্ত আমরা খোশ গল্পগুজবে রাত পার করছিলাম। সেই রাতেই আমরা আমাদের পরের রাতে বারবিকিউ করার পরিকল্পনা করেছিলাম। এবং এভাবেই আমার সফরের প্রথম দিনটি শেষ হয়েছিল।

শান্তি কেন্দ্র, মাদারীপুর 
শান্তি কেন্দ্রের সম্মুখ ভাগ
চলবে……