অনেকদিন ধরে মনটা আনচান করছিলো কোথাও থেকে ঘুরে আসার। ভ্রমনবিলাসী মন আমার। একটি সময় ছিলো যখন এ মনটা ঘুরে বেড়াতো বাংলাদেশের এপাশ থেকে অপাশ। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে ভ্রমন যেন আমার জীবন থেকে হারিয়ে গিয়েছিলো। গত ৩ বছর ধরে ভোলা আর ঢাকা ছাড়া কোথাও ঘুরতে যাওয়া হয়নি। আর তাই যখনই কাছাকাছি সুন্দর কোন জায়গা ভ্রমনের কথা শুনি; তা আর মানা করতে পারিনা।
To know about this travel blog in English click the link below: https://iamnrdurjoy.wordpress.com/2020/11/16/nrds-tour-055-inenglish
আমার স্ত্রী গত কয়েকদিন ধরে আমাকে বলছিলো আমাদের বাসার কাছাকাছি নাকি সুন্দর কাঁশফুল দেখার জায়গা আছে। আমি শুনে অবাক হলাম। জিজ্ঞাসা করলাম, কোথায়? ও বললো বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার কথা। আমি শুনে বললাম দিয়াবাড়ি থেকে সুন্দর কিনা? ও বললো, হা! দিয়াবাড়ি থেকে কোন অংশে কম নয়।


যেই ভাবা, সেই কাজ! গত ১৭ অক্টোবর ২০২০ ইং তারিখে আমি, আমার স্ত্রী, সন্তান আর শাশুড়িকে নিয়ে ঘুরতে গিয়েছিলাম বসুন্ধরার সেই সুন্দর কাঁশফুলের জায়গায়। ৪:১০ মিনিটে আমরা আমাদের ভ্রমন গন্তব্যের জন্য রওয়ানা দিলাম। পথের মাঝে আমার শাশুড়িকে সাথে নিয়ে নিয়েছিলাম। যেহেতু আমার বাসা থেকে বসুন্ধরা অতটা দূরে না, তাই খুব সহজেই শুধুমাত্র ১৫ টাকা রিক্সাভাড়া দিয়ে পৌছে গিয়েছিলাম।
আসুন আমার ভ্রমন বর্ণনাটি জানার পূর্বে কাঁশফুল সমন্ধে কিছু জেনে নেই:

কাশফুলের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা : কাশফুল ভারতীয় উপমহাদেশের একটি ঘাসের স্থানীয় ফুল । সাচ্চারুম স্পন্টেনিয়াম কাশফুলের একটি বৈজ্ঞানিক নাম। নদীর তীরে ফুলফোটা শ্বেতশুভ্র কাশবন দেখতে খুবই সুন্দর। এর আদিবাস রোমানিয়া। এটি ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল এবং ভুটানের মতো দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব দেশেই জন্মায়। কাশফুল মূলত ছন গোত্রীয় এক ধরনের ঘাস। নদীর ধার, জলাভূমি, চরাঞ্চল, শুকনো রুক্ষ এলাকা, পাহাড় কিংবা গ্রামের কোনো উঁচু জায়গায় কাশের ঝাড় বেড়ে ওঠে। তবে নদীর তীরেই এদের বেশি জন্মাতে দেখা যায়। এর কারণ হল নদীর তীরে পলিমাটির আস্তর থাকে এবং এই মাটিতে কাশের শিকড় সহজে সম্প্রসারিত হতে পারে। এটি বহুবর্ষজীবী ঘাস। রাইজোম্যাটাস শিকড়ের মাধ্যমে এটি উচ্চতায় প্রায় তিন মিটার পর্যন্ত বাড়ে। কাশফুল প্রতি বছর তৈরি হওয়া বর্ষার বন্যার দ্বারা পলি সমভূমিকে খুব দ্রুত জন্মায়। কাশ ফুল প্লাবনভূমির নিম্নতম অংশে প্রায় খুব সুন্দরভাবে জন্মায়। কাশফুলের ঘাসভূমি ভারতীয় গণ্ডার এর একটি গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। নেপালে কাশফুল ঘাসের ছাদ বা বেড়া সবজি বাগানের জন্য ব্যবহার করা হয়। এটি খুব দ্রুত উপনিবেশ বা বসতি স্থাপন করার দুর্দান্ত ক্ষমতা রাখে। এই বৈশিষ্ট্যের জন্য, এটি একটি আক্রমণাত্মক প্রজাতিতে পরিণত হয়েছে যা ফসলি জমি এবং চারণভূমির উপর দখল করে।
যখন কাশফুল জন্মায়: শরত ঋতুতে সাদা ধবধবে কাশফুল ফোঁটে।বাংলাদেশের সব অঞ্চলেই কাশফুল দেখতে পাওয়া যায়। কাশফুল পালকের মতো নরম এবং এর রঙ ধবদবে সাদা। গাছটির চিরল পাতার দুই পাশ খুবই ধারালো
কাশ ফুলের ব্যবহার: কাশফুলের বেশ কিছু ঔষধি গুণ রয়েছে। এটি আয়ুর্বেদে ব্যবহৃত হয়। পিত্তথলিতে পাথর হলে নিয়মিত গাছের মূলসহ অন্যান্য উপাদান দিয়ে ওষুধ তৈরি করে পান করলে পিত্তথলির পাথর দূর হয়। কাশমূল বেটে চন্দনের মতো নিয়মিত গায়ে মাখলে গায়ের দুর্গন্ধ দূর হয়। এছাড়াও শরীরে ব্যথানাশক ফোঁড়ার চিকিৎসায় কাশের মূল ব্যবহৃত হয়।

সাহিত্যে কাশফুল: সাহিত্যে নানাভাবে কাশফুলের কথা এসেছে । রবীন্দ্রনাথ প্রাচীন গ্রন্থ ‘কুশজাতক’ কাহিনী অবলম্বন করে ‘শাপমোচন’ নৃত্যনাট্য রচনা করেছেন। কাশফুল মনের কালিমা দূর করে। কাশফুল শুভ্রতা অর্থে ভয় দূর করে শান্তির বার্তা বয়ে আনে। শুভ কাজে কাশফুলের পাতা বা ফুল ব্যবহার করা হয়।

কাশফুলের অন্যান্য তথ্য: প্রাগৈতিহাসিককাল থেকে বাংলাদেশ ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে কাশফুল ছিল। কাশফুলের অন্য একটি প্রজাতির নাম কুশ। এরা দেখতে প্রায় কাশফুলের মতোই। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ ‘পুরাণ-এ কুশের স্থান খুব উঁচুতে। গ্রামের বাড়ি বা পুকুর পাড়ে ইচ্ছা করলে কাশফুল লাগানো যেতে পারে। তবে সে ক্ষেত্রে কিছুটা ঠাণ্ডা ও বালু মিশ্রিত স্থান বেছে নিতে হবে।
কাঁশফুলে পৌছে আমাকে যে বিষয়টি আমাকে ভুল ভালো লাগিয়েছে তাহলে এর সৌন্দর্য। প্রায় এক ঘন্টা বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার সুন্দর কাশফুল ভ্রমণ শেষে আমরা বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। পথিমধ্যে আমার ছেলে দুলকার খুবই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলো । আর তাই বারবার আমাদের দিকে তাকাচ্ছিলো। আমার ছেলেটাও আমাদের মতে ঘুরতে খুবই পছন্দ করে। আর তাই শত ক্লান্ততা থাকার পরও ঘুরার সময় কান্নাকাটি করেনা। এভাবেই আমার ঐদিনের কাঁশফুল ভ্রমণ শেষ হলো।



Leave a comment