করোনা বাংলাদেশের পর্যটনের জন্য আশীর্বাদ

মোঃ নাইমুর রহমান (@iamnrdurjoy):

করোনা ভাইরাস বা কোবিড-১৯, একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্যোগ। মানবসভ্যতা হয়তোবা যুদ্ব, হিংসা, বিদ্বেষ নিয়েই এতদিন ব্যস্ত ছিল। আজ মানবসভ্যতার সকলকেই একত্র হয়ে এই দুর্যোগের বিরুদ্বেই সোচ্চার হতে হচ্ছে। ২০১৯ সালে সর্বপ্র্রথম চীনের উহান প্রদেশে এ ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী পাওয়া যায়। ২৬ আগস্ট ২০২০ তারিখে worldometers.info এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমান বিশ্বের প্রায় সকল দেশেই এ পর্যন্ত মোট ২৪.২২ মিলিয়ন মানুষ কোবিড-১৯ ভাইরাসে আক্রান্ত। এ ভাইরাসে আক্রান্তের প্রায় রোগী ৩.৪১% রোগী ইতিমধ্যে মৃত্যুবরণ করেছেন এবং ৬৯.২১% রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। বাংলাদেশে ৮ মার্চ ২০২০ তারিখে সর্বপ্রথম পাওয়া রোগী দিয়ে কোবিড-১৯ তার ভয়াবহতা শুরু করেছিল। বর্তমানে বাংলাদেশ প্রায় ৩০৩,০০০ জন মানুষ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত। আশার কথা হচ্ছে বাংলাদেশে এ ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর মৃত্যুর সংখ্যা অন্যান্য দেশের তুলনায় কম।

হয়তোবা বাংলাদেশ বিশ্বের মধ্যে অতিকায় ক্ষুদ্র একটি দেশ। কিন্তু যুগে যুগে অনেক ভিনদেশী এসে কিন্তু এদেশকেই তাদের স্থায়ী বাসস্থান বানিয়েছে। কেননা সবুজ শ্যামল এ দেশটি পর্যটন শিল্পে যে বৈচিত্রময় তা সহজেই পর্যটকদের আকর্ষণ করতে পারে। এদেশে পর্যটকদের আকর্ষিত করার জন্য পৃথিবীর দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার নেই; সাথে রয়েছে পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন- সুন্দরবন, সমুদ্রকন্যা নামে খ্য়াত কুয়াকাটা, দুটি পাতা একটি কুঁড়ির সবুজ রঙের নয়নাভিরাম চারণভূমি-সিলেট, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা পার্বত্য চট্টগ্রাম, বাংলার আভিযাত্যের অতীতের স্বাক্ষীস্বরুপ উত্তরাঞ্চলের প্রত্নতাত্তিক নিদর্শনগুলো।

পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহৎ সমুদ্র সৈকত,কক্সবাজার

বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বড় চালিকাশক্তি পর্যটন শিল্প। করোনা ভাইরাসের কারণে এ শিল্পের উপর ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। মার্চের পর করোনার প্রভাবে বন্ধ ছিল সকল ধরণের যোগাযোগ ব্যবস্থা। এমনকি বন্ধ ছিল সকল পর্যটন স্থান। তবে দীর্ঘ কয়েক মাস বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশ সরকারের আদেশক্রমে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে প্রায় সকল পর্যটন স্থান এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু হয়েছে। বাংলাদেশর প্রেক্ষাপটে করোনা ভাইরাস সত্যিই পর্যটন শিল্পের জন্য আশীর্বাদস্বরুপ। কেননা বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় বাংলাদেশের মানুষদের আকর্ষণের প্রায় সব ধরণের পর্যটন কেন্দ্র এ দেশে বিদ্যমান। বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রায় সকল মানুষই ঘরবন্ধী মানবেতর জীবনযাপন করছে। তাদের বিনোদনের একমাত্র ক্ষেত্র হতে পারে পর্যটন শিল্প। মাস ছয়েক আগেও এদেশের মানুষ সমুদ্র সৈকত ঘুরতে যাওয়ার জন্য প্রাধান্য দিতো সুদূর আমেরিকার মানামি বিচ বা ব্যাংককের পাতায়া বিচ। সেই সময় তাদের মাথায় পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহৎ সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারের চিন্তা না থাকেলেও আজ কিন্তু তাদের পছন্দের তালিকায় সবচেয়ে উপরে থাকবে কক্সবাজারের নাম।

আমরা সবাই জানি দীর্ঘ চার মাসের বেশি সময় ধরে পর্যটনকেন্দ্রগুলো বন্ধ থাকার কারণে প্রকৃতি যেন ফিরে পেয়েছে তার হারিয়ে যাওয়া সৌন্দর্য। আজ দেখা যায়না ম্যানগ্রোভ বন; সুন্দরবনে অবাধ বন্যপ্রাণী হত্যা; আজ দেখা যায়না কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে খালি বোতলের স্তুপ আর ময়লা আবর্জনা। আমরা এতোদিন আমেরিকার এডভেঞ্চার সিনেমাগুলোতেই দেখে এসেছি ডলফিন, তিমির খেলাধুলা। হয়তোবা এদেশে তিমি দেখা না গেলেও আমরা এ সময়ে এসে দেখতে পারছি কীভাবে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে ডলফিনরা খেলাধুলা করছে। কাঁকড়ার অবাধ বিচরণ সবার দৃষ্টি কেড়েছে। এইযে এত সব বিচিত্র জিনিস আমরা দেখতে পারছি তাকি করোনা ভাইরাসের কল্যানে নয়? আমরা কীভাবে অস্বীকার করতে পারবো যে করোনাভাইরাস এদেশর পর্যটন শিল্পের জন্য আশীর্বাদ নয়?

এইতো সেদিনের কথা, আমার এক বন্ধু যাকে সবসময় বই নিয়ে থাকতে দেখেছি, সে হঠাৎ আমাকে বলে উঠলো কোথাও ঘুরতে যাবার কথা। করোনার কারণে এতদিন যেসকল মানুষরা এদেশকে দেখার, চিনার , উপভোগ করার চিন্তাও করেনি সেসকল মানুষরাও আজ এদেশকে দেখতে চায়, উপভোগ করতে চায়। আজ এমন একটি মানুষ খুজে পাওয়া দুস্কর হবে যে এদেশকে, এদেশের পর্যটনকেন্দ্রগুলোকে উপভোগ করতে চায়না।

করোনা ভাইরাসের কারণে দেশের বহু প্রতীভাবান তরুণ আজ চাকরি হারিয়ে বেকার হয়েছে। আজ তারা যে যার জায়গা থেকে দেশকে বহিবির্শ্বে তুলে ধরার সময় পেয়েছে। সেক্ষত্রে তারা নিজেদের জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন, শহর, গ্রামের মধ্যে পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তুলতে পারে। কেননা পর্যটনকেন্দ্র গড়ে  তুলতে কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ করতে হয়না। বিনিয়োগ করতে হয় দেশের প্রতি ভালোবাসা আর নতুনকে দেখার প্রবল ইচ্ছা।

প্রকৃতির সাথে আমাদের হৃদয়ের বন্ধন আমরা বুঝতে পেরেছি এ করোনা ভাইরাসের কারণেই। একটি সময় ছিল যখন আমরা সপ্তাহে একদিন সিনেফ্লেক্সে সিনেমা দেখাকেই বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম মনে করতাম। আমরা মনে করতাম প্রতিদিন ফেসবুক, ইউটিউভ, নেটফ্লিক্স উপভোগ করাটাই পৃথিবীর সেরা সুখ। করোনার কারণে আমরা এ ধরণের ভার্চুয়াল বিনোদন প্রচুর পরিমাণে পেয়েও একটি জিনিসের কিন্তু আমরা সত্যিই অনেক অভাব অনুভব করছি। সেটা হচ্ছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে অবলোকন করা। এজন্যই এখন জানালার পাশে দাড়ালেই মন চায় আপন মনে ঐ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি। আকাশের ঐ চাঁদকে যেন আরো কাছ থেকে দেখতে ইচ্ছে করে। আজ মানুষের এ মনস্তাত্তিক বদলের কারণকি করোনা ভাইরাস নয়?

করোনার কারণে আমরা এ ধরণের ভার্চুয়াল বিনোদন প্রচুর পরিমাণে পেয়েও একটি জিনিসের কিন্তু আমরা সত্যিই অনেক অভাব অনুভব করছি। সেটা হচ্ছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে অবলোকন করা। এজন্যই এখন জানালার পাশে দাড়ালেই মন চায় আপন মনে ঐ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি। আকাশের ঐ চাঁদকে যেন আরো কাছ থেকে দেখতে ইচ্ছে করে।

একটা সময়ছিল প্রায় সকলেরই ইচ্ছে ছিল বন্ধুবান্ধব, আত্নীয়স্বজন, পরিবার নিয়ে কোথাও ঘুরতে যাওয়া। সেসময় দেখা যেত প্রত্যেকেরই যাওয়ার ইচ্ছা থাকার পরও ছুটির সময় এক না হবার কারণে কোথাও ঘুরতে যেতে পারছে না। বর্তমান পরিস্থিতি অবলোকন করলে দেখা যায় করোনার কারণে প্রায় বেশিরভাগ মানুষই অলস সময় কাটাচ্ছে । যারাও অফিস করছে সপ্তাহের প্রায় অর্ধেক সময় বাসায় অঘোষিত ছুটি কাটাচ্ছে। এজন্য বেশিরভাগ মানুষ মাসের কিছু দিন সময়টাকে কাজে লাগাতে বাংলাদেশের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে ভ্রমণে যাচ্ছে।

কক্সবাজারে মেরিন ড্রাইভ, সরকারের করা বিগত ১০ বছরের অন্যতম কাজ

বর্তমানে বাংলাদেশের বেকার সমস্যা নিরসনে পর্যটন শিল্প ব্যাপক ভূমিকা পালন করতে পারে। বর্তমান সরকার বিগত কয়েক বছর পর্যটন শিল্পের জন্য অনেক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে। বাংলাদেশের প্রায় পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে পর্যটনমোটেল তৈরি করা, কক্সবাজারে মেরিন ড্রাইভ, ইনানী সমুদ্র সৈকত, হাজাছড়া জলপ্রপাত, দক্ষিণাঞ্চলের সুন্দরবনের ব্যাপক পরিবর্তন, কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের আধুনিকায়ন পার্বত্য চট্টগ্রামের নীলগিরী, নিলাচল, মেঘলা, সাজেক ভ্যালীর উন্নয়ন ইত্যাদি সরকারের করা বিগত ১০ বছরের অন্যতম কাজ। এক পরিসংখ্যানে জানা যায় বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১৮ লাখ তরুণ চাকরির বাজারে আসছে যার একটি বিরাট অংশ বেকার থেকে যাচ্ছে। যেহেতু পর্যটন একটি শ্রমঘন শিল্প তাই বেকারত্ব নিরসনে বাংলাদেশে পর্যটন শিল্প একটি বিরাট ভূমিকা পালন করতে পারে। আর করোনাকালীন সময়ে তরুণদের জন্য পর্যটনশিল্প একটি যথেষ্ট গ্রহণযোগ্য মাধ্যম হতে পারে। হয়তোবা সেদিন আর বেশি দূরে নেই যেদিন ইউরোপ, আমেরিকার সাথে পাল্লা দিয়ে এশিয়ার এই ছোট্ট দেশ বাংলাদেশ ও পর্যটনশিল্পে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠবে। তখন হয়তো কারো মাথায় এচিন্তা নাও আসতে পারে করোনা কীভাবে বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পে বিপ্লব নিয়ে এসেছিলো। কিন্তু এর জর্ন শুধু সরকারের সাহায্য নয় আমাদের আপামর জণগণকেও কাজ করতে হবে। আর এভাবেই আমরা আমাদের সোনার বাংলার ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে পৃথিবীর মাঝে মাথা উঁচু করে দাড়াতে পারবো।

ইনশাআল্লাহ্।

Published by Naimur Rahman

About Me Hi, I’m Md. Naimur Rahman Durjoy (NRD) — an explorer of knowledge, stories, technology, and the beauty of the world. 👋 My journey started with a simple dream: to create a platform where experiences, ideas, information, and inspiration could come together in one place. That dream began on **14 June 2020**, and today it proudly lives as: 🌐 **[www.the-nrd.com](http://www.the-nrd.com)** Professionally, I work in the field of **Internal Audit, Finance, and Assurance**, with experience across multiple industries in Bangladesh. Alongside my corporate journey, I have always carried a deep passion for: ✈️ Traveling & discovering new places 📖 Writing articles and sharing experiences 🇧🇩 Exploring the hidden beauty and untold stories of Bangladesh 🌎 Learning about world culture, history, and tourism 💻 Technology, IT, and digital innovation 🎥 Creating informative travel and lifestyle content Through this website, I aim to build a knowledge-sharing community where people can learn something new, discover amazing destinations, explore useful technology insights, and enjoy meaningful stories from different walks of life. Here you’ll find: ✅ Travel videos & detailed tour guides ✅ Articles on technology, lifestyle, and real-life experiences ✅ Unknown facts about Bangladesh and the world ✅ Tourist attractions and cultural insights ✅ IT-related knowledge and digital tips ✅ Inspiration to explore, learn, and grow I believe every journey becomes more meaningful when shared with others. That’s why **The NRD** is not just a website — it’s a growing universe of curiosity, learning, adventure, and connection. 💚 Thank you for being part of this journey. Your support, feedback, and encouragement mean a lot to me. 🙏 📍 **Visit:** **[www.the-nrd.com](http://www.the-nrd.com)** 🚀 *“From one click begins a new journey of discovery.”*

Leave a comment