লেখক: মো: নাইমুর রহমান (দুর্জয়)
০১. কুষ্টিয়া এক নজরে
কুষ্টিয়া বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা বিভাগের একটি ঐতিহ্যবাহী প্রশাসনিক জেলা। শিল্প, সাহিত্য, রাজনীতি ও লোকসংস্কৃতির অপার অবদানের জন্য জেলাটি সমগ্র বাংলাদেশে “সংস্কৃতিক রাজধানী” হিসেবে অবিসংবাদিত পরিচিতি লাভ করেছে। কুষ্টিয়ার অধিবাসীদের কথা বলার ভাষাকে বাংলাদেশে মান্য বাংলা বা প্রমিত রূপের সবচেয়ে শুদ্ধ রূপ হিসেবে গণ্য করা হয়।
ভৌগোলিকভাবে প্রায় ১,৬০৮.৮ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই জেলাটি ৬টি উপজেলা নিয়ে গঠিত—কুষ্টিয়া সদর, কুমারখালী, খোকসা, মিরপুর, ভেড়ামারা এবং দৌলতপুর। এতে ৫টি পৌরসভা এবং ৬৬টি ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে। কুষ্টিয়া জেলার উত্তরে পদ্মা নদীর অপর তীরে রাজশাহী, নাটোর ও পাবনা জেলা; দক্ষিণে ঝিনাইদহ জেলা; পূর্বে রাজবাড়ী জেলা এবং পশ্চিমে চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর জেলা ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ অবস্থিত। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে জেলাটির প্রায় ৪৬.৬৯ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত সীমানা রয়েছে।

০২. নামের ইতিহাস ও ভৌগোলিক পরিচয়
কুষ্টিয়া অঞ্চলের নামকরণের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে একাধিক তাৎপর্যপূর্ণ ঐতিহাসিক তত্ত্ব দেখতে পাওয়া যায়:
- পাট বা ‘কুষ্টা’ তত্ত্ব: প্রাচীনকাল থেকেই এ অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে পাট উৎপন্ন হতো। স্থানীয় গ্রামীণ উপভাষায় পাটকে ‘কুষ্টা’ বা ‘কোষ্টা’ কিংবা ‘কুষ্টি’ বলা হতো; ধারণা করা হয় এই ‘কুষ্টি’ শব্দ থেকেই কালক্রমে ‘কুষ্টিয়া’ নামের উৎপত্তি ঘটেছে। ১৮২০ সালে প্রকাশিত ওয়াল্টার হ্যামিলটনের গেজেটিয়ারে এই স্থানটিকে ‘Kustee’ বা ‘কুষ্টি’ হিসেবে লিপিবদ্ধ দেখা যায়।
- ফারসি ‘কুশতহ’ তত্ত্ব: মোগল ও ঔপনিবেশিক আমলের নথিপত্রে ব্যবহৃত ফারসি শব্দ ‘কুশতহ’ (যার অর্থ ছাই দ্বীপ, ভস্মভূমি বা নদীভাঙনজাত পলিদ্বীপ) থেকে অঞ্চলটির নাম রূপান্তরিত হয়ে কুষ্টিয়া হতে পারে বলে অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন।
- ‘কুষ্টি বন্দর’ তত্ত্ব: মোগল সম্রাট শাহজাহানের শাসনামলে গড়াই ও পদ্মার অববাহিকায় গড়ে ওঠা গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দর ‘কুষ্টি বন্দর’ কেন্দ্র করে এ শহরের নামের বিকাশ ঘটে।
- আঞ্চলিক উচ্চারণ রূপান্তর: স্থানীয় মানুষের মুখের আঞ্চলিক উপভাষায় শব্দটি ‘কুষ্টে’ বা ‘কুইষ্টে’ উচ্চারিত হতো, যা পরবর্তীতে দাপ্তরিকভাবে ‘কুষ্টিয়া’ নাম ধারণ করে।
ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক বিবর্তন: খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীতে গ্রিক ভূগোলবিদ টলেমির প্রণীত মানচিত্রে গঙ্গা অববাহিকায় পলিগঠিত যে ক্ষুদ্র দ্বীপগুলোর উল্লেখ মেলে, অনেক প্রত্ন-গবেষক সেগুলোকে কুষ্টিয়ার প্রাচীন ভৌগোলিক অস্তিত্ব বলে চিহ্নিত করেন। ১৭২৫ সালে কুষ্টিয়া নাটোর জমিদারির অধীন কান্ডানগর পরগনার সিভিল প্রশাসনের আওতায় ছিল। ১৭৭৬ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এটিকে যশোর জেলায় এবং ১৮২৮ সালে পাবনা জেলায় অন্তর্ভুক্ত করে। পরবর্তীতে ১৮৫৯-১৮৬০ সালের নীল বিদ্রোহের প্রেক্ষাপটে ১৮৬১ সালে কুষ্টিয়াকে মহকুমা হিসেবে ঘোষণার পর ১৮৬২ সালে প্রাতিষ্ঠানিক মহকুমা গঠন করা হয় এবং ১৮৭১ সালে এটি নদীয়া জেলার অধীনে আসে। ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাজনের সময় নদীয়া ভেঙে কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর মহকুমা নিয়ে স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হিসেবে কুষ্টিয়া জেলা গঠিত হয়। এরপর ১৯৮৪ সালে চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর পৃথক জেলায় উন্নীত হলে বর্তমান কুষ্টিয়া জেলা ৬টি থানা নিয়ে পুনর্গঠিত হয়।
০৩. লালন শাহ ও বাউল সংস্কৃতি
কুষ্টিয়াকে লোকসাধনা ও ভাবদর্শনের প্রাণকেন্দ্র বানিয়েছেন বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ (১৭৭৪/১৭৭৯–১৮৯০)। তিনি ছিলেন একজন কালজয়ী মরমি কবি, সুফি সাধক, সুরকার ও সমাজ সংস্কারক। জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও গোত্রভিত্তিক প্রাতিষ্ঠানিক আনুষ্ঠানিকতা ছুড়ে ফেলে তিনি মানবতাবাদ ও আত্মশুদ্ধির সর্বজনীন বার্তা প্রচার করেছিলেন।

লালন শাহের বাউল দর্শনে ইসলামিক সুফিবাদের প্রাতিষ্ঠানিক তত্ত্ব—যেমন তৌহিদ (একত্ববাদ), ইশক (ঐশ্বরিক প্রেম), ফানা (অহং বিলোপ) ও মুর্শিদতত্ত্ব (গুরু-শিষ্য সম্পর্ক)—এর সাথে বৈষ্ণব ভক্তিধারা এবং সহজিয়া বৌদ্ধ সাধনার অনন্য সংমিশ্রণ ঘটেছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, উপাসনালয়ে নয়, বরং পবিত্র মানবদেহের অভ্যন্তরেই ‘মনের মানুষ’ বা পরম সত্য বিরাজ করে। তাঁর রচিত সহস্রাধিক গানের মধ্যে “খাঁচার ভিতর অচিন পাখী”, “বাড়ির পাশে আরশিনগর”, “মিলন হবে কত দিনে” ইত্যাদি বাংলা লোকসঙ্গীত ও বিশ্ব সাহিত্যের অতুলনীয় সম্পদ। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লালনের গানের প্রতি গভীর অনুরাগী ছিলেন; তিনি লালনের ২৯৮টি গান সংগ্রহ করেন এবং ২০টি গান তৎকালীন বিখ্যাত ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রকাশ করেছিলেন।
০৪. ছেঁউড়িয়া ও লালন মাজার
কুষ্টিয়া শহরের অদূরে কুমারখালী উপজেলার ছেঁউড়িয়া গ্রামে বাউল সম্রাট লালন শাহ তাঁর আখড়াবাড়ি স্থাপন করেন এবং ১২৯৭ বঙ্গাব্দের ১ কার্তিক (১৮৯০ সালে) সেখানেই শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ১৯৬৩ সালে তাঁর সমাধিস্থলে আধুনিক অল-হোয়াইট মাজার ভবন এবং ২০০৪ সালে অডিটোরিয়ামসহ লালন একাডেমি কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়।
প্রতি বছর কার্তিক মাসে (অক্টোবর) লালনের তিরোধান দিবস উপলক্ষে এবং ফাল্গুন মাসে দোল পূর্ণিমায় ছেঁউড়িয়ায় ঐতিহ্যবাহী লালন স্মরণোৎসব ও মেলার আয়োজন করা হয়। এই উৎসবগুলোতে দেশ-বিদেশের হাজার হাজার বাউল, সুফি, ভক্ত ও পর্যটকের মহামিলন ঘটে। উৎসবে রাত্রিভর সাধুসঙ্গ, বাউল গান এবং গুরুর প্রতি ভক্তি প্রকাশের ঐতিহ্যবাহী আচারসমূহ—যেমন গুরুকার্য, রাখাল সেবা, অধিবাস, বাল্য সেবা ও পূর্ণ সেবা—সম্পন্ন হয়।
০৫. রবীন্দ্রনাথ ও শিলাইদহ
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার শিলাইদহ কুঠিবাড়ি বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। কুষ্টিয়া শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে মনোরম আম-কাঁঠালের বাগান ও জলাশয়ে ঘেরা ১১ একর বিস্তৃত পরিসরে এই তিনতলা পিরামিড আকৃতির কুঠিবাড়িটি অবস্থিত।
১৮০৭ সালে প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর এক উইলের মাধ্যমে শিলাইদহের (প্রাচীন নাম খোরশেদপুর বা শেলিদহ) জমিদারি লাভ করেন এবং ১৮১৩ সালে এটি নির্মিত হয়। ১৮৯১ থেকে ১৯০১ সালের মধ্যবর্তী সময়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পারিবারিক জমিদারি তদারকির সুবাদে শিলাইদহে দীর্ঘ সময় বাস করেন। শিলাইদহের শান্ত পরিবেশে বা পদ্মার বুকে বোটে বসে কবি তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ—“সোনার তরী”, “চিত্রা”, “”চৈতালী”, “কথা ও কাহিনী”, “ক্ষণিকা”, “নৈবেদ্য”, “খেয়া” এবং “গীতাঞ্জলি” ও “গীতিমাল্য”-এর বহু অমূল্য কবিতা ও গান রচনা করেন। ১৯১২ সালে এই শিলাইদহে বসেই কবি ‘গীতাঞ্জলি’র ইংরেজি অনুবাদ শুরু করেছিলেন, যা ১৯১৩ সালে তাঁকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের বিরল সম্মান এনে দেয়।
এছাড়া ব্যবসায়িক প্রয়োজনে ১৮৯৫ সালে কুষ্টিয়া শহরের মিলপাড়ায় কবি ও তাঁর সুরেন্দ্রনাথ-বলেন্দ্র নাথের যৌথ উদ্যোগে ‘টেগর অ্যান্ড কোম্পানি’র কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দোতলা ‘টেগর লজ’ নির্মিত হয়, যা কুষ্টিয়ার আরেকটি বিখ্যাত দর্শনীয় স্থান।
০৬. পদ্মা-গড়াই ও নদীর গল্প
কুষ্টিয়ার ভূপ্রকৃতি ও সমৃদ্ধি মূলত এর বুক চিরে প্রবাহিত নদীগুলোর ওপর নির্ভরশীল। জেলার প্রধান নদ-নদীগুলো হলো পদ্মা, গড়াই, কালীগঙ্গা, কুমার, হিসনা, মাথাভাঙ্গা ও গড়াই খাল। উত্তর দিক দিয়ে প্রবাহিত বিশাল পদ্মা নদী থেকে উৎপাদিত হয়ে গড়াই নদী দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়েছে; যেখানে পদ্মা ও গড়াই নদীর মিলনস্থল ‘পদ্মা-গড়াই মোহনা’ এক অপরূপ নৈসর্গিক সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছে।
ঐতিহাসিক ও প্রকৌশল বিস্ময়:
- হার্ডিঞ্জ ব্রিজ: ভেড়ামারা ও পাবনার পাকশীর মধ্যবর্তী পদ্মা নদীর ওপর নির্মিত ১.৮ কিলোমিটার দীর্ঘ শতবর্ষী স্টিল ট্রাস রেলসেতু। ১৮৮৯ সালে প্রস্তাবিত এবং ১৯১৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হওয়া এই ব্রিজের গভীরতম ভিত্তি ও স্থাপত্যশৈলীর জন্য তৎকালীন ব্রিটিশ চিফ ইঞ্জিনিয়ার রবার্ট উইলিয়াম গেলসকে ‘স্যার’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ব্রিজের ৯ম ও ১২তম স্প্যান ক্ষতিগ্রস্ত হলে স্বাধীন বাংলাদেশে যৌথ প্রচেষ্টায় এটি পুনর্নির্মাণ করা হয়।
- লালন শাহ সেতু: হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ঠিক সমান্তরালে নির্মিত ১.৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ১৮.১০ মিটার প্রশস্ত আধুনিক মহাসড়ক সেতু, যা ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন ঘটিয়েছে।
- হরিপুর সেতু: গড়াই নদীর ওপর থানাপাড়া ও হরিপুর ইউনিয়নের মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী একটি দৃষ্টিনন্দন সেতু।

০৭. মীর মশাররফ হোসেন ও সাহিত্য
বাংলা গদ্য সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক এবং মুসলিম লেখকদের মধ্যে প্রথম আধুনিক ধারার সৃষ্টিকর্তা মীর মশাররফ হোসেন কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার লাহিনীপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। কারবালার করুণ কাহিনি অবলম্বনে তাঁর রচিত কালজয়ী মহাকাব্যিক উপন্যাস ‘বিষাদ সিন্ধু’ বাংলা সাহিত্যের সর্বকালের সেরা সাহিত্যকর্মগুলোর একটি।
কুমারখালীর লাহিনীপাড়ায় মীর মশাররফ হোসেনের স্মৃতিবিজড়িত বাস্তুভিটা, স্মৃতি জাদুঘর, লাইব্রেরি ও অডিটোরিয়াম সংরক্ষিত রয়েছে। কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের প্রতিষ্ঠিত প্রেসে মীর মশাররফ হোসেনের বিখ্যাত উপন্যাস প্রথম মুদ্রিত হয়েছিল।
০৮. কাঙাল হরিনাথ ও সাংবাদিকতা
বাংলায় গ্রামীণ, নির্ভীক ও লোকায়ত সাংবাদিকতার পথিকৃৎ কাঙাল হরিনাথ মজুমদার (১৮৩৩–১৮৯৬) কুমারখালীর কুণ্ডুপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ঔপনিবেশিক শাসক, নীলকর ও স্থানীয় জমিদারদের অত্যাচার-শোষণের বিরুদ্ধে সাধারণ কৃষকদের পক্ষে কলম ধরতে তিনি ১৮৬৩ সালে ঐতিহাসিক সাময়িক পত্রিকা ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’ প্রকাশ করেন।
সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি কুমারখালীতে ‘এম. এন. প্রেস’ (মথুরানাথ প্রেস) স্থাপন করেন, যা থেকে তৎকালীন বহু বিখ্যাত গ্রন্থ মুদ্রিত হতো। তিনি বাউল দল গঠন করে ‘ফিকির চাঁদ বাউল’ নামে অসংখ্য কালজয়ী মরমি গানও রচনা করেছিলেন। তাঁর রচিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘বিজয় বসন্ত’, ‘ব্রহ্মাণ্ড দেব’ এবং ‘ফিকির চাঁদের গীতাবলী’ উল্লেখযোগ্য। কুমারখালীতে তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থে কাঙাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
০৯. ঐতিহাসিক স্থাপনা ও দর্শনীয় স্থান
কুষ্টিয়া জেলা জুড়ে ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব ও লোকজ ঐতিহ্যের বহু ঐতিহাসিক নিদর্শন ছড়ানো রয়েছে:
- জগতী রেলওয়ে স্টেশন: ১৮৬২ সালের ১৫ নভেম্বর ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে কর্তৃক কলকাতা রানাঘাট থেকে জগতী পর্যন্ত ৫৩.১১ কিলোমিটার ব্রডগেজ লাইন চালুর মাধ্যমে নির্মিত বাংলাদেশের সর্বপ্রথম রেলওয়ে স্টেশন।
- ঝাউদিয়া শাহী মসজিদ: কুষ্টিয়া সদর উপজেলায় অবস্থিত প্রাচীন মুঘল স্থাপত্যশৈলীর তিন গম্বুজ ও চমৎকার অভ্যন্তরীণ পরিবেশ বিশিষ্ট এক দৃষ্টিনন্দন প্রত্নতাত্ত্বিক মসজিদ।
- বিপ্লবী বাঘা যতীন ও স্বাধীনতা আন্দোলন: কুষ্টিয়ার কয়া গ্রামে জন্মগ্রহণকারী বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় (বাঘা যতীন, ১৮৭৯–১৯১৫) ১৯০৬ সালে একটি মাত্র ছোরা নিয়ে বাঘ হত্যা করে এই খ্যাতি পান। তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির সহায়তায় ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র ভারতীয় বিদ্রোহের পরিকল্পনা করেছিলেন এবং ১৯১৫ সালে বালেশ্বরের যুদ্ধে শহীদ হন।
- নীল বিদ্রোহের কেন্দ্রস্থল: ১৮৫৯-১৮৬০ সালের ঐতিহাসিক নীল বিদ্রোহের অন্যতম প্রধান ঘাঁটি ছিল কুষ্টিয়ার শালঘর মধুয়া ও আমলা সদরপুর, যেখানে মহিলা জমিদার প্যারী সুন্দরী দেবী নীলকর টি. আই. কেনির বিরুদ্ধে কৃষকদের সংগঠিত করে সফল প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন।
- অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থান: মোহিনী মিলস (১৯০৮ সালে মোহিনী মোহন চক্রবর্তী প্রতিষ্ঠিত এশিয়ার তৎকালীন অন্যতম প্রধান বস্ত্রকল), রেণউইক যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোং (১৮৮১/১৮৯৬ সালে রবীন্দ্র পরিবার ও ব্রিটিশ প্রকৌশলীদের উদ্যোগে গঠিত ঐতিহাসিক কৃষি সরঞ্জাম কারখানা), গোপীনাথ জিউর মন্দির, চাঁপাইগাছি বিল, খোকসার কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য পরিচিত ‘ইউটিউব গ্রাম’, এবং স্বাধীন বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত প্রথম সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
১০. কুষ্টিয়ার খাবার

কুষ্টিয়া জেলার রয়েছে বেশ কিছু ঐতিহ্যবাহী সুস্বাদু খাবার ও মিষ্টান্ন, যা সারা দেশে সমান জনপ্রিয়:
- তিলের খাজা: তিল ও চিনির সুষম মিশ্রণে তৈরি প্রায় ২০০ বছরের প্রাচীন মচমচে ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি। কুষ্টিয়ার তিলের খাজা জাতীয় পর্যায়ে ভৌগোলিক নির্দেশক (GI) পণ্য হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি লাভ করেছে।
- কুলফি মালাই: খাঁটি গাভীর দুধ অতি মাত্রায় ঘন করে জালে ফুটিয়ে, এলাচের সুবাস মিশিয়ে বরফ-লবণের বিশেষ প্রক্রিয়ায় প্রস্তুত করা কুষ্টিয়ার বিখ্যাত কৃত্রিম রাসায়নিক মুক্ত সুস্বাদু কুলফি আইসক্রিম। কুমারখালী ও কয়া গ্রাম এই কুলফি মালাই তৈরির প্রধান কেন্দ্র, যা কুষ্টিয়ার ‘রশিদ ভাইয়ের কুলফি মালাই’ নামে দেশজুড়ে সমাদৃত।
১১. আধুনিক কুষ্টিয়া ও অর্থনীতি
বর্তমানে কুষ্টিয়া কেবল সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক ও শিল্প কর্মকাণ্ডের অন্যতম বড় চালিকাশক্তি:
- খাজানগর অটো রাইস মিল হাব: কুষ্টিয়ার খাজানগরে ৩৫০ থেকে ৪০০টিরও বেশি আধুনিক স্বয়ংক্রিয় রাইস মিল গড়ে উঠেছে, যা সমগ্র বাংলাদেশের মোট চালের চাহিদার প্রায় ৩০% থেকে ৭০% সরবরাহ করে। ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে এই খাজানগরেই জনপ্রিয় ‘মিনিকেট’ চালের উদ্ভাবন ও বাণিজ্যিক বিপণন শুরু হয়।
- শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি: বিসিক শিল্পনগরী সমৃদ্ধ শিল্পে পরিপূর্ণ। এখানে রয়েছে দেশের সর্ববৃহৎ ক্যাবল প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বিআরবি ক্যাবলস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, কিয়াম মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ, দেশের অন্যতম বৃহৎ ভেড়ামারা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, ভেড়ামারা কুষ্টিয়া সুগার মিলস, এবং দেশের তামাক শিল্পের প্রধান প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র।
- কৃষি ও পেশা: জেলার ৪১.৫% মানুষ প্রত্যক্ষ কৃষিকাজে এবং ১৩.৯% মানুষ কৃষি শ্রমে নিয়োজিত। প্রধান কৃষিপণ্যের মধ্যে রয়েছে ধান, পাট, আখ, তামাক, গম, ভুট্টা, সরিষা, তিল ও পান।
১২. কেন কুষ্টিয়া বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক মানচিত্রে বিশেষ?

কুষ্টিয়া কেবল ভৌগোলিক একটি ভূখণ্ড নয়; এটি স্বাধীনচিন্তা, মানবিক দর্শন, সাহিত্য আন্দোলন এবং স্বাধিকার সংগ্রামের এক অবিনশ্বর সূতিকাগার।
- আধ্যাত্মিক সাম্যবাদ: লালন শাহের প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মান্ধতাবিরোধী, জাতপাতহীন ‘মানব ধর্ম’ ও বাউল সংস্কৃতি এই জনপদ থেকেই বিকশিত হয়ে পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে।
- বিশ্বসাহিত্যের মেলবন্ধন: রবীন্দ্রনাথের নোবেলজয়ী সাহিত্য সৃষ্টি ও বিশ্বমানবিক চেতনার প্রস্ফুটন ঘটেছে শিলাইদহের প্রশান্ত প্রকৃতিতেই।
- সাহিত্যের নতুন উন্মেষ: মীর মশাররফ হোসেনের ‘বিষাদ সিন্ধু’র মতো গদ্যের মাইলফলক এবং কাঙাল হরিনাথের সাংবাদিকতার মাধ্যমে নিপীড়িত মানুষের পক্ষে শোষকবিরোধী সোচ্চার উচ্চারণ এই মাটিকে বিশেষ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।
- ভাষাগত বিশুদ্ধতা: বাংলাদেশের সবচেয়ে শুদ্ধ প্রমিত উচ্চারণের কথ্য ভাষা এই অঞ্চলেই চর্চিত হয়।
- মুক্তিযুদ্ধের প্রথম চেতনার কেন্দ্র: ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ১৯৭১ সালের ১ এপ্রিলেই কুষ্টিয়া প্রথম শত্রুমুক্ত হয়। তাছাড়া, তৎকালীন বৃহত্তর কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার ভবের পাড়ায় (বর্তমান মুজিবনগর) ১৭ এপ্রিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করেছিল।
লালন শাহের একতারা, রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহ, গড়াই-পদ্মার হাওয়া এবং স্বাধীনতাকামী আন্দোলনের গৌরবময় ইতিহাস মিলিয়ে কুষ্টিয়া আজও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক মানচিত্রে সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে বিরাজ করছে।

Leave a Reply