বৃষ্টির এক সন্ধ্যায় মিলনায়তনে আবৃত্তি উৎসব চলছিল। নিহাদ যখন মঞ্চে দাঁড়িয়ে জীবনানন্দ দাসের কবিতা আবৃত্তি করছিল, তখন দর্শকসারিতে বসে মুগ্ধ হয়ে শুনছিল প্রাচী রহমান। শব্দের ঝংকার আর নিহাদের গম্ভীর কণ্ঠস্বর প্রাচীর হৃদয়ে এক অদ্ভুত স্পন্দন তৈরি করেছিল। অনুষ্ঠানের শেষে প্রাচী এগিয়ে গিয়ে নিহাদকে অভিনন্দন জানাল। সেই শুরু; কবিতার ছন্দে তাদের প্রথম আলাপ।

এরপর থেকে তাদের প্রায়ই দেখা হতো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়ায় কিংবা লাইব্রেরির কোণায়। প্রাচী মনে মনে নিহাদকে ভালোবেসে ফেলেছিল, কিন্তু নিহাদ তাকে দেখত কেবল একজন ভালো বন্ধু হিসেবে। নিহাদ যখন সাহিত্য নিয়ে কথা বলত, প্রাচী শুধু তার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকত। সে বারবার তার ভালোবাসা প্রকাশ করতে চেয়েও বন্ধুত্বের হারানোর ভয়ে পিছিয়ে যেত।

একদিন নিহাদ প্রাচীর বাড়িতে বেড়াতে গেল। প্রাচীর মা আদিবা বেগম নিহাদকে খুব স্নেহভরে অভ্যর্থনা জানালেন। আদিবা যখন নিহাদের সাথে গল্প করছিলেন এবং তাকে নিজ হাতে বানানো পিঠা পরিবেশন করছিলেন, তখন নিহাদ বুঝতে পারল এই পরিবার তাকে কতটা পছন্দ করে। প্রাচীর বাড়ির প্রতিটি কোণ ছিল শিল্পবোধে ভরপুর, যা নিহাদকে মুগ্ধ করল।

আদিবা বেগম অন্য ঘরে গেলে প্রাচী নিহাদকে তার ছোটবেলার ছবির অ্যালবাম দেখাতে শুরু করল। পুরনো দিনগুলোর গল্প করতে করতে প্রাচীর চোখে এক ধরনের মায়া ফুটে উঠেছিল। নিহাদ লক্ষ্য করল, প্রাচীর সান্নিধ্যে সে এক অন্যরকম শান্তি খুঁজে পাচ্ছে। তবে তখনও সে তার নিজের অনুভূতির নাম দিতে পারল না।

কিন্তু সুখের সেই মুহূর্তগুলো দীর্ঘস্থায়ী হলো না। ক্যাম্পাসে একদিন তুচ্ছ বিষয় নিয়ে নিহাদ ও প্রাচীর মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি হলো। নিহাদের কিছু কড়া কথায় প্রাচী খুব আঘাত পেল। চোখের জল মুছে প্রাচী সেদিন দ্রুত ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে গেল। নিহাদ ভেবেছিল এটা হয়তো সাধারণ কোনো রাগ, কিন্তু সে বুঝতে পারেনি প্রাচীর মনে কতটা অভিমান জমেছে।

এরপর টানা তিন দিন প্রাচী ক্যাম্পাসে এল না। নিহাদ তার ফোনে বারবার কল দিলেও সে ধরল না। প্রাচীর বন্ধু-বান্ধবরাও তার কোনো খোঁজ দিতে পারল না। নিহাদ লক্ষ্য করল, ক্যাম্পাসের যে চত্বরে তারা রোজ বসত, সেই জায়গাটা এখন মরুভূমির মতো খাঁ খাঁ করছে। প্রাচীর অভাব তাকে প্রতি মুহূর্তে দহন করতে শুরু করল।

নিহাদ বুঝতে পারল, প্রাচী কেবল তার বন্ধু নয়, বরং তার অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রাচীর অনুপস্থিতি তাকে বুঝিয়ে দিল যে সে মনে মনে প্রাচীকেই ভালোবাসে। নিজের ভুল বুঝতে পেরে সে অস্থির হয়ে উঠল। সে বারবার সেই জায়গাগুলোর কথা মনে করতে লাগল যেখানে প্রাচী শান্তিতে সময় কাটাতে পছন্দ করত।

অবশেষে নিহাদ শহরের শেষ প্রান্তে অবস্থিত একটি নির্জন বোটানিক্যাল গার্ডেনে পৌঁছাল। সে জানত, যখন প্রাচীর মন খুব খারাপ থাকে, সে এখানেই এসে বসে থাকে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর নিহাদ দেখল, রঙবেরঙের ফুলের বাগানের মাঝে একটি কাঠের বেঞ্চে প্রাচী চুপচাপ বসে আছে। তার দৃষ্টি ছিল শূন্য, যেন সে কোনো গভীর ঘোরের মধ্যে আছে।

নিহাদ ধীর পায়ে প্রাচীর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। প্রাচী তাকে দেখে অবাক হলো এবং উঠে দাঁড়াতে চাইল, কিন্তু নিহাদ তার হাত ধরে ফেলল। কম্পিত কণ্ঠে নিহাদ বলল, “আমাকে ক্ষমা করো প্রাচী। তোমাকে হারানোর ভয়ে আমি বুঝেছি আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসি।” প্রাচীর চোখের কোণে আবার জল জমে উঠল, তবে এবার তা ছিল আনন্দের।

সেই পড়ন্ত বিকেলে ফুলের গন্ধে ভরা বাগানে নিহাদ তার ভালোবাসার চূড়ান্ত স্বীকারোক্তি দিল। তারা একে অপরের হাত ধরে সিদ্ধান্ত নিল যে আগামীর সব পথ তারা একসাথেই পাড়ি দেবে। কবিতার মাধ্যমে শুরু হওয়া সেই আলাপ পূর্ণতা পেল এক গভীর প্রেমে, যা তাদের সারা জীবনের বন্ধনে আবদ্ধ করল।
